সরকারি সহায়তা না মেলায় স্কুলের রাস্তা সংস্কারে শিক্ষার্থীরা

স্কুলে যেতে হবে, কিন্তু যাওয়ার রাস্তা নেই। টানা বর্ষণে কাদায় ডুবে গেছে পথ, ভেঙে গেছে ইটের সলিং। প্রতিদিন হোঁচট খেয়ে, কাদায় মাখামাখি হয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে একসময় অপেক্ষা না করে নিজেরাই কোদাল-ঝুড়ি হাতে নিল কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। সরকারি সহায়তার অপেক্ষা না করে শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে নিজেদের স্কুলে যাওয়ার রাস্তাই নিজেরা সংস্কার শুরু করেছে মাগুরার শালিখা উপজেলার আলুকদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

বুধবার (২২ জুলাই) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা ভাঙাচোরা কাঁচা-পাকা রাস্তায় ইটের খোয়া ছড়িয়ে চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করছে। কেউ ঝুড়িতে করে খোয়া আনছে, কেউ হাত দিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে, আবার কেউ সমান করছে। তাদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখে বিস্মিত হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শালিখা উপজেলা সদর আড়পাড়া থেকে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আলুকদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। মূল সড়ক দরিশলই চৌমুহনী থেকে বিদ্যালয়ে যেতে প্রায় আধা কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। বহু বছর আগে রাস্তাটিতে ইটের সলিং দেওয়া হলেও ট্রাক্টর, ট্রলি ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের চলাচলে সেটি ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়। সাম্প্রতিক টানা বর্ষণে রাস্তাটি আরও কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল হয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবে প্রধান শিক্ষক মো. বিল্লাল হোসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনের পর ইউএনও বিদ্যালয় পরিদর্শন করলেও দীর্ঘদিনেও রাস্তা সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরে শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের সহায়তায় ইটের খোয়া সংগ্রহ করে নিজেরাই রাস্তাটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় শিক্ষার্থীরা। এ কাজে সহযোগিতা করেন স্থানীয় বিএনপি নেতা শুভেন্দু বিশ্বাস।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাতুল মোল্যা বলে, ‘সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না। অনেকবার কাদায় পড়ে কাপড় নষ্ট হয়েছে। স্কুলে আসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তাই আমরা নিজেরাই রাস্তা ঠিক করার কাজ করছি।’

প্রধান শিক্ষক মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে রাস্তাটি খুবই খারাপ অবস্থায় রয়েছে। শতাধিক শিক্ষার্থীর নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছি, কিন্তু কাজ হয়নি। তাই শিশুদের কষ্ট দেখে বসে থাকতে পারিনি। নিজেদের উদ্যোগে অন্তত চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করছি।’

এ বিষয়ে শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, ‘বিদ্যালয়ের আবেদন আমরা পেয়েছি এবং বিষয়টি পরিদর্শন করেছি। রাস্তাটি মূলত জেলা পরিষদের অধীন হওয়ায় এলজিইডির মাধ্যমে কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয়দের মতে, হাতে ইটের খোয়া তুলে নিতে হয়েছে শুধু স্কুলে পৌঁছানোর জন্য। এই দৃশ্য একদিকে যেমন শিশুদের দায়িত্ববোধের অনন্য দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘদিনের অবহেলারও নীরব সাক্ষী।