বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, দেশের উপকূলের প্রাকৃতিক ঢাল এবং ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করে এই বন। অথচ সেই সুন্দরবনই এখন চোরা শিকারি, বনসম্পদ লুটেরা ও অবৈধ মৎস্য শিকারিদের ক্রমবর্ধমান দৌরাত্ম্যে ক্ষতবিক্ষত। বন বিভাগের নিয়মিত অভিযান, শত শত মামলা ও গ্রেফতার সত্ত্বেও বন অপরাধ থামছে না; বরং অপরাধীরা আগের চেয়ে আরও সংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হরিণ শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, অভয়ারণ্যে অবৈধভাবে কাঁকড়া আহরণ এবং বনজ সম্পদ পাচার সব মিলিয়ে সুন্দরবনে সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। জনবল সংকট, বিশাল বনাঞ্চল, দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ এবং বননির্ভর মানুষের অর্থনৈতিক সংকট এই অপরাধ দমনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এক বছরে ২৯৪ মামলা, গ্রেফতার ৩৯৬
পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন অপরাধের ঘটনায় ২৯৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৯৬ জনকে গ্রেফতার করা হলেও এখনও ৬৩ জন পলাতক রয়েছেন। একই সময়ে বন বিভাগের অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস, ৫ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ, ৬ হাজার ৯৮৬টি অবৈধ কাঁকড়া ধরার ফাঁদ এবং বিপুল পরিমাণ মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সরঞ্জাম।
সংঘবদ্ধ চক্রের নিয়ন্ত্রণে বন অপরাধ
সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন অপরাধ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ চক্র, যারা পরিকল্পিতভাবে বনাঞ্চলে প্রবেশ করে হরিণ শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ এবং বনজ সম্পদ পাচারের মতো অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে শুধু অভয়ারণ্যে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের অভিযোগেই খুলনা রেঞ্জে ১০৬টি মামলা হয়েছে। বিষ প্রয়োগে মাছ ধরার ঘটনায় হয়েছে ৩৩টি মামলা। এছাড়া হরিণ শিকার ও বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত আরও ৩৩টি মামলা রেকর্ড হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের বন কর্মকর্তারা জানান, অনেক সময় অভিযানের খবর আগেই অপরাধীদের কাছে পৌঁছে যায়। আবার দুর্গম বনাঞ্চল ও অসংখ্য নদী-খালের কারণে অভিযানে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় অপরাধীরা সহজেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
হরিণ শিকারে বদলেছে কৌশল
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বর্তমানে শিকারিরা আগের চেয়ে আরও আধুনিক কৌশল ব্যবহার করছে। গভীর বনের নির্জন এলাকায় কয়েক কিলোমিটারজুড়ে ফাঁদ পেতে রাখা হয়। রাতে বনে ঢুকে হরিণ শিকার করে দ্রুত নদীপথে মাংস পাচার করা হয়। গত এক বছরে উদ্ধার হওয়া ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস এবং প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ ফাঁদ পরিস্থিতির ভয়াবহতারই প্রমাণ। বন বিভাগ ইতোমধ্যে হরিণ শিকার ও বন্যপ্রাণী নিধনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ১৩৫ জনের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে। তাদের গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিষ দিয়ে মাছ শিকার: নীরব পরিবেশ বিপর্যয়
হরিণ শিকারের পাশাপাশি সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে শুধু মাছ নয়, নদীর পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে ছোট মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির পোনা এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে অভিযান চালিয়ে ৮৭ বোতল নিষিদ্ধ কীটনাশক জব্দ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বল্প সময়ে বেশি মাছ পাওয়ার লোভে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ভয়াবহ।
ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার বন, সীমিত জনবল
প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত সুন্দরবন পাহারা দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন বনরক্ষীরা।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অনেক টহল ফাঁড়িতে প্রয়োজনীয় জনবল নেই। আধুনিক জলযান, দ্রুতগতির নৌযান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের সংকটও রয়েছে। ফলে বিশাল বনাঞ্চলে সব সময় কার্যকর নজরদারি বজায় রাখা সম্ভব হয় না।
বিকল্প জীবিকার অভাবও বাড়াচ্ছে চাপ
পরিবেশবিদদের মতে, বন অপরাধের একটি বড় কারণ উপকূলীয় বননির্ভর মানুষের অর্থনৈতিক সংকট। মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতা সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল বহু পরিবার বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে বনাঞ্চলে প্রবেশ করছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র।
বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন, ‘শুধু অভিযান চালিয়ে বন অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।’
সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘স্মার্ট পেট্রোল টিম, বিশেষ টহল দল এবং ফুট পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। তবে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো অভিযানের সময় কিছু জেলের আগ্রাসী আচরণের মুখেও বনরক্ষীদের পড়তে হয়। তারপরও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, ‘বনরক্ষীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন ব্যবহার ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে বন অপরাধ আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে স্থায়ী সাফল্যের জন্য জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।’