সাতক্ষীরায় দিন দিন বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত দুই দিনে জেলায় নতুন করে ২৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৬ সেপ্টেম্বর ১৫ জন এবং ৭ সেপ্টেম্বর আরও ১৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় এ সময়ে সাতজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানো হয়েছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাতক্ষীরার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ২৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে ৩২ জন চিকিৎসাধীন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন অন্যরা।
তবে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬ জনে। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত জেলায় ২৭৫ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানো হয়েছে এবং ২২৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. জয়ন্ত কুমার সরকার বলেন, বর্তমানে জেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ কিছুটা বেড়েছে। এ অবস্থায় বাড়ির আশপাশ ও আঙিনা পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি কোথাও পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। জ্বরসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা শ্যামনগরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উপজেলায় ৪৬ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে আগস্ট মাসেই আক্রান্ত হন ৩২ জন। তাদের ১৫ জন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন। বাকি ১৭ জন বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিয়েছেন।
সেপ্টেম্বরের প্রথম সাত দিনেই শ্যামনগরে নতুন করে ১৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন রোগী চিকিৎসাধীন।
প্রায় চার লাখ মানুষের এই উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্ধারিত শয্যা রয়েছে মাত্র চারটি। ৫০ শয্যার হাসপাতালটির অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও দীর্ঘদিনের। ফলে ডেঙ্গু রোগীর চাপ আরও বাড়লে চিকিৎসাসেবা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকে হাসপাতালের পরিবর্তে বাড়ি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। পৌরসভার বাসিন্দা হাফেজ শহিদুল ইসলাম প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতে তার চিকিৎসা চলছে।
একইভাবে কাড়িমাড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা রউফ আলী ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর সরকারি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন।
অন্যদিকে হাসপাতালে ভর্তি থাকা কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনেরা চিকিৎসক-নার্সদের সেবায় সন্তোষ জানিয়েছেন। এক রোগীর মা বলেন, বমি ও বুকব্যথা নিয়ে তার সন্তানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে। চিকিৎসক ও নার্সরা নিয়মিত রোগীর খোঁজখবর নিচ্ছেন।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রুনী জানান, তিন দিন আগে হাসপাতালে এসে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করান। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসা শুরু হয়। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে এবং চিকিৎসকেরা নিয়মিত রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করছেন।
জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে শ্যামনগরের মতো বড় উপজেলায় সীমিতসংখ্যক শয্যা নিয়ে বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দেওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথাসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।