দুই বছর আগের দরপত্রে কাটা হচ্ছে তরতাজা গাছ

একদিকে পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণের আহ্বান, অন্যদিকে মহাসড়কের পাশে বেড়ে ওঠা বড় বড় তরতাজা গাছে চলছে করাতের টান। ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে বেড়ে ওঠা রেইনট্রি, মেহগনি, আকাশমণিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ একে একে কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে উধাও হচ্ছে দীর্ঘদিনের সবুজ বেষ্টনী, ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে মহাসড়কের দুই পাশ। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রায় আড়াই বছর আগে দরপত্রে বিক্রি করা গাছ এখনো কীভাবে সেই পুরোনো কার্যাদেশের ভিত্তিতে কাটা হচ্ছে?

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ-জীবননগর আঞ্চলিক মহাসড়কের কোটচাঁদপুর উপজেলার কাশিপুর থেকে এলাঙ্গী এলাকায় চলছে গাছ কাটার এ কর্মযজ্ঞ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। এখনো কয়েকটি স্থানে অব্যাহত রয়েছে গাছ কাটার কাজ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাসড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বড় আকৃতির রেইনট্রি, মেহগনি, আকাশমণিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। অধিকাংশ গাছই ছিল ঘন সবুজ ও সতেজ। কোথাও গাছের গোড়া কেটে ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও পড়ে আছে ডালপালা। আবার কোথাও কাটা গাছ সরিয়ে নেওয়া হলেও মাটিতে রয়ে গেছে শুধু গাছের গোড়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর এসব গাছ মহাসড়কের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পথচারী ও যানবাহনের যাত্রীদের ছায়া দিয়ে এসেছে। অথচ এখন কোনো নতুন গাছ বড় হয়ে ওঠার আগেই পুরোনো গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে।

২০২৪ সালের দরপত্রে কাটা হচ্ছে গাছ
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এসব গাছ কাটার জন্য ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল সামাজিক বন বিভাগের যশোর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই বছরের ২০ জুন কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু নানা কারণে তখন গাছ কাটা সম্ভব হয়নি। প্রায় দুই বছর পর এখন সেই পুরোনো কার্যাদেশের ভিত্তিতেই গাছ কাটা হচ্ছে।

বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোটচাঁদপুরে ৪০টি লটে এবং শৈলকুপায় ছয়টি লটে গাছ বিক্রি করা হয়েছে। তবে কার্যাদেশে নির্দিষ্ট করে গাছের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে শুধু লটের সংখ্যা ও বিক্রয়মূল্য উল্লেখ রয়েছে। এসব গাছের মোট বিক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ২৫ টাকা। সূত্র জানায়, প্রতিটি লটে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি গাছ রয়েছে। সেই হিসাবে শুধু কোটচাঁদপুরের ৪০টি লটেই গাছের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর বাইরে শৈলকুপার ছয়টি লটেও গাছ কাটার কাজ চলছে।

গাছ কাটা বন্ধের পর আবার শুরু
জেলা বন বিভাগ বলছে, ২০২৪ সালে দরপত্র ও কার্যাদেশ দেওয়া হলেও ৫ আগস্টের পর অর্ন্তর্বতীকালীন সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মৌখিক নির্দেশনায় সবুজ ও তরতাজা গাছ কাটা বন্ধ রাখা হয়। ফলে কোটচাঁদপুর ও শৈলকুপায় গাছ কাটার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা না থাকায় পুরোনো কার্যাদেশের ভিত্তিতে আবার গাছ কাটার কাজ শুরু হয়েছে। দীর্ঘ সময় কার্যাদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ার পর একই কার্যাদেশের ভিত্তিতে বর্তমান সময়ে গাছ কাটার আইনগত ও প্রশাসনিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গাছ কাটার কার্যাদেশ দেওয়া হয় মেসার্স আর কে এন্টারপ্রাইজের নামেন প্রতিষ্ঠানকে। যার সত্ত্বাধিকারি কুষ্টিয়ার মৃত আবুল কাশেমের ছেলে বকুল হোসেন। তবে সরেজমিনে গাছ কাটার কাজ তদারক করতে দেখা যায় কালীগঞ্জের কাঠ ব্যবসায়ী আক্কাচ আলীকে। কার্যাদেশপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী বকুল হোসেনকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। কাঠ ব্যবসায়ী আক্কাচ আলী বলেন, ‘কুষ্টিয়ার একজন ঠিকাদার দরপত্রের মাধ্যমে গাছগুলো কিনেছেন। তার কাছ থেকে আমি গাছ কিনে নিয়ে কাটছি। সরকারি সব নিয়ম মেনেই গাছ কাটা হচ্ছে।’

বন বিভাগের বক্তব্য
বন বিভাগ কোটচাঁদপুরের ডেপুটি বন রেঞ্জার প্রণব কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘গাছগুলো অনেক আগে দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। বিভিন্ন কারণে তখন কাটা সম্ভব হয়নি। এখন কাটা হচ্ছে। সামাজিক বনায়ন প্রকল্পে গাছ লাগানোর পর একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। মেয়াদ শেষে নিয়ম অনুযায়ী গাছ বিক্রি করা হয়। প্রকল্পভেদে এই মেয়াদ ১০ বছর থেকে শুরু করে ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। বর্তমানে যে গাছগুলো কাটা হচ্ছে, সেগুলো ২০ থেকে ২৫ বছর মেয়াদের।’

ঝিনাইদহ জেলা সহকারী বন সংরক্ষক মোছা. জুমুয়া জামান বলেন, ‘অর্ন্তর্বতীকালীন সরকারের সময় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের মৌখিক নির্দেশনায় গাছ কাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে নির্বাচিত সরকার আসার পর কোনো নির্দেশনা না থাকায় এখন পুরোনো দরপত্রের ভিত্তিতে আবার গাছ কাটা হচ্ছে।’