পাহাড়ি ঢলে নদীগর্ভে বিদ্যালয়, বিপর্যস্ত কলমাকান্দা

ভারতের মেঘালয়ে টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোণার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা উপজেলায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ দুর্যোগ। প্রবল স্রোতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভেঙে গেছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ভেসে গেছে মাছের ঘের, বালুচাপায় নষ্ট হয়েছে ফসলি জমি ও আমনের বীজতলা। পানি কিছুটা কমলেও নতুন করে ঢলের আশঙ্কায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্ত এলাকার মানুষ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার ভোর থেকে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার খারনৈ, নাজিরপুর, রংছাতি ও লেংগুরা ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় খারনৈ ইউনিয়নের গজারমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীর তীব্র ভাঙনে বিদ্যালয়টির অফিস কক্ষ ও একটি শ্রেণিকক্ষ মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সঙ্গে ভেসে যায় আসবাবপত্র, শিক্ষাসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র।

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, পাহাড়ি ঢলের তীব্রতায় নলছাপড়া বাজার থেকে বালুচড়া উচ্চবিদ্যালয়গামী সড়কের প্রায় ১০০ ফুট অংশ ধসে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ওই সড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিনের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ।

ঢলের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। চেংনী নদীর ভাঙন এবং পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা বালুতে প্রায় ৫০ একর আবাদি জমি ঢেকে গেছে। তলিয়ে গেছে রোপা আমনের বীজতলা, ভেসে গেছে অসংখ্য পুকুর ও মাছের ঘের। এতে শতাধিক কৃষক ও মৎস্যচাষি আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠে তারা দেখেন বিদ্যালয়ের বড় একটি অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে অনেক বাড়িঘর, দোকানপাট ও মসজিদে তিন থেকে চার ফুট পানি ঢুকে পড়ে, ফলে পরিবারগুলোকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

গজারমারী এলাকার বাসিন্দা রিপন মিয়া বলেন, প্রতিবছর পাহাড়ি ঢল এলেই তাদের এলাকার নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয়। দীর্ঘদিন ধরে খাল পুনঃখনন ও বড় আকারের কালভার্ট নির্মাণের দাবি জানানো হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ না পেয়ে বাড়িঘর ও সড়ক ভেঙে ফেলছে।

একই এলাকার আবুল কালাম বলেন, এলজিইডি নির্মিত গজারমারী সড়কে প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম কালভার্ট রয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নামতে না পেরে সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের বসতবাড়িও প্লাবিত হচ্ছে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, উবদাখালী নদীর পানি কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারতের মেঘালয়ে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি আরও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু কলমাকান্দা নয়, পার্শ্ববর্তী দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামেও ঢলের পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। নতুন করে বন্যার শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।

কলমাকান্দার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামসুজ্জামান আসিফ বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। বিদ্যালয় ভবন, সড়ক, ফসলি জমি ও অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

প্রতিবছরই মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোণার সীমান্তবর্তী জনপদে নদীভাঙন, বালুচাপা ও আকস্মিক প্লাবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। স্থানীয়দের দাবি, শুধু সাময়িক সংস্কার নয়, নদীতীর রক্ষা, খাল পুনঃখনন, পর্যাপ্ত কালভার্ট নির্মাণ এবং টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না। এখন সবার দৃষ্টি মেঘালয়ের আবহাওয়ার দিকে—সেখানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।