চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে নিহত বাংলাদেশি যুবক

বেশি বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ায় পাড়ি দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার যুবক মামুন মিয়া (২৫)। পরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার ও সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) মামুনের সঙ্গে থাকা ঝিনাইদহের রাজন মিয়া জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হন। ওই হামলায় রাজনও গুরুতর আহত হয়েছিলেন। পরে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন বলে জানান।

নিহত মামুন মিয়া উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে।

পরিবারের ভাষ্য, সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় গত ৭ মে ‘জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে ইলেকট্রনিক শ্রমিক হিসেবে কাজের জন্য রাশিয়া যান মামুন। উচ্চ বেতনের চাকরির আশায় এজেন্সিটির সঙ্গে তার সাড়ে আট লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। তার সঙ্গে আরও প্রায় ৩০ জনের একটি দল রাশিয়ায় যায়।

পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র চার দিনের মাথায় এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট একটি পাচারকারী চক্র মামুনসহ ওই দলের যুবকদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। এরপর তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে জোরপূর্বক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মামুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা ঘরের সামনের উঠানে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার। খবর পেয়ে স্বজন ও আশপাশের লোকজনও তাদের বাড়িতে জড়ো হন।

মামুনের স্ত্রী মহিমা আক্তার বলেন, গত ২৬ আগস্ট স্বামীর সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। তখন মামুন জানিয়েছিলেন, তিনি যুদ্ধে আছেন। প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ হেঁটে ওয়াই-ফাই সংযোগ পাওয়া যায় এমন জায়গায় গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, দুই সন্তানকে নিয়ে এখন কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। মরদেহ কীভাবে দেশে আনব, সেটাও জানি না। সরকারের কাছে আমার স্বামীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।

মামুনের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় চার মাস আগে ব্যাংকঋণ ও ধার করে সাড়ে ৮ লাখ টাকা জোগাড় করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছেন। এখনও সেই ঋণ ও ধার পরিশোধ করতে পারেননি। সমিতির লোকজন টাকা নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, একমাত্র সন্তানের এমন করুণ পরিণতি হবে, ভাবতেও পারিনি। দুই নাতিকে কীভাবে বড় করব, তাও বুঝতে পারছি না।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জামাল উদ্দিন বাচ্চু বলেন, মামুন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। রাশিয়ায় গিয়ে ড্রোন হামলায় তার নিহত হওয়ার খবর তিনি শুনেছেন। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নান্দাইল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে পরবর্তীতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।