উচ্চ বেতন, মর্যাদাপূর্ণ পদ কিংবা চাকরির সামাজিক পরিচিতিকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয় আমাদের সমাজে। সেই প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে জীবনের অন্য পথ বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী নায়লা শারাফ। প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি, ব্যাংকের আকর্ষণীয় পদ এমনকি ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগও ছেড়ে দিয়ে তিনি এখন নেত্রকোণা সদরের পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পড়াচ্ছেন।
বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করে নায়লা শারাফ এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে কাজের পরিবেশ ও অনিয়মের সঙ্গে আপস করতে না পেরে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই চাকরি ছেড়ে দেন। পরে জনতা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে যোগ দিলেও ব্যাংকের যান্ত্রিক কর্মপরিবেশ তাকে ধরে রাখতে পারেনি। ৩৪তম বিসিএসে কোয়ালিফাইড হওয়ার পরও সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি তিনি।
কেন একের পর এক আকর্ষণীয় চাকরির সুযোগ ছেড়ে দিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা পোস্টকে নায়লা শারাফ বলেন, অর্থ বা খ্যাতির প্রতি তার কোনো মোহ নেই। অল্পতেই তিনি সন্তুষ্ট হন। একটি চকলেট কিংবা ভালোবেসে দেওয়া একটি ফুলও তাকে আনন্দ দেয়। বড় পদ বা বিপুল অর্থের চেয়ে সাধারণ জীবন এবং দিন শেষে নিশ্চিন্ত ও পরিতৃপ্ত ঘুমকেই বেশি মূল্য দেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত নিজের জন্য বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পথ। গত সাত বছর ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন নায়লা। তার কাছে এই পেশা শুধু চাকরি নয়, শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার একটি সুযোগ।
পাঠ্যবইয়ের বাইরেও মূল্যবোধের শিক্ষা
নায়লার শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শেখার পরিধি শুধু পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। সত্য বলা, সাহসী হওয়া এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার বিষয়েও তিনি শিশুদের নিয়মিত শিক্ষা দেন।
নিজের শিক্ষার্থীদের দেওয়া পরামর্শের কথা বলতে গিয়ে নায়লা বলেন, কোনো কাজ করার আগে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে—কাজটি এমন কি না, যা সবার সামনে নির্দ্বিধায় স্বীকার করা যায়। নিজের কাজের বিষয়ে অন্যের অনুমোদনের চেয়ে নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহিকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিতে শেখান শিশুদের।
প্রধান শিক্ষকের চোখে বিদ্যালয়ের সম্পদ
পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লীলা রানী ভৌমিকের মতে, নায়লা শারাফ বিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেও প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের নিজের সন্তানের মতো যত্ন নিয়ে পড়ানোকে তিনি বিরল উদাহরণ হিসেবে দেখেন।
প্রধান শিক্ষক বলেন, নায়লা কখনো ঘড়ির কাঁটা দেখে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করেন না। শিশুদের পাঠ সহজ ও আকর্ষণীয় করতে তিনি নিজেই ছবি আঁকেন, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করেন এবং বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত সময় দিয়ে এসব প্রস্তুত করেন। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও সততা শেখাতেও তার ভূমিকা প্রশংসনীয়।
ভিকারুন্নিসার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে চান প্রান্তিক শিশুদের মধ্যে
নায়লা নিজে ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন। সেখানে পাওয়া সুযোগ-সুবিধা ও শিক্ষার মান প্রান্তিক পরিবারের সন্তানদের কাছেও পৌঁছে দিতে চান তিনি। এ কারণেই পাঠ্যবইয়ের বিষয়গুলো শিশুদের কাছে সহজবোধ্য করে তুলতে নিজের উদ্যোগে বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করেন, ছবি আঁকেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত সময় দেন।
নিজের বর্তমান পেশা নিয়ে নায়লা বলেন, অন্য কোনো পেশায় থাকলে হয়তো অনেক অর্থের মালিক হতে পারতেন, আর মানুষ তাকে মেধাবী বলত। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে তিনি যে ভালোবাসা পাচ্ছেন, তার কাছে সেটিই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ছোট ছোট শিশুর ভালোবাসার প্রকাশ তাকে যে আনন্দ দেয়, অন্য কোনো অর্জনের সঙ্গে তার তুলনা হয় না। এই ভালোবাসার কারণেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষায় থেকে গেছেন বলে জানান।
সমাজের কথায় থামেননি
বুয়েটের ডিগ্রি নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়াকে অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেননি। আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছ থেকেও নানা মন্তব্য শুনতে হয়েছে নায়লাকে। তবে এসব কথাকে গুরুত্ব দেননি তিনি।
নায়লা বলেন, অনেকে তাকে পাগল বলেন, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও এমন কথা শুনতে হয়। কিন্তু তিনি জানেন, তিনি পাগল নন। ভিকারুন্নিসায় পড়াশোনা করে তিনি যে সুযোগ পেয়েছেন, প্রান্তিক শিশুরাও যেন সেই মানের যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে—এটাই তার লক্ষ্য। মৃত্যুর পর এসব শিশু তার জন্য একটু প্রার্থনা করুক, এটিই তার প্রত্যাশা।
মেধাবীদের প্রাথমিক শিক্ষায় আসার আহ্বান
উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষকদের যে গুরুত্ব দেওয়া হয়, বাংলাদেশেও সেই মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে মনে করেন নায়লা। তার মতে, মেধাবী ও নিষ্ঠাবান তরুণেরা এ পেশায় এগিয়ে এলে প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র বদলাতে পারে।
নায়লা বলেন, প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে শুধু দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে যারা আসতে পারবেন, প্রাথমিক শিক্ষায় তাদের স্বাগত। শিক্ষকরা দক্ষ ও নিষ্ঠাবান হলে সরকারও একসময় সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে বাধ্য হবে। বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষকতা সম্মানজনক পেশা; বাংলাদেশেও সেটি সম্ভব, যদি আরও মেধাবী ও নিবেদিত তরুণ এ পেশায় আসেন।
ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য, অর্থ কিংবা সামাজিক মর্যাদার প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে নায়লা শারাফ বেছে নিয়েছেন শিশুদের নিয়ে কাজ করার জীবন। প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের ভালো শিক্ষা, মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটিই তার কাছে বড় অর্জন। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তার মতো নিবেদিত শিক্ষকদের এই পথচলা তাই আলাদা করে মনোযোগ পাওয়ার দাবি রাখে।