সার-ওষুধের দাম চড়া, আমনে লাভ নিয়ে শঙ্কায় কৃষক

জয়পুরহাটের ক্ষেতলালের মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। প্রায় ৪৫ দিনের আমন ধান বাতাসে দুলছে। কোথাও আগাছা পরিষ্কার করছেন কৃষক, কোথাও চলছে সার প্রয়োগ, আবার কোথাও মাজরা পোকার আক্রমণ ঠেকাতে দেওয়া হচ্ছে কীটনাশক। চোখজুড়ানো সবুজ মাঠে ফলনের আশা থাকলেও কৃষকের মনে স্বস্তি নেই। কারণ, ধান ঘরে তোলার আগেই বাড়ছে উৎপাদন খরচ। অথচ ধানের বাজারদর তেমন বাড়েনি। ফলে আমন চাষ শেষে লাভের হিসাব মেলানো নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ক্ষেতলালের কৃষকেরা।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ক্ষেতলালে ১০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। গত মৌসুমের তুলনায় এবার চাষ বেড়েছে ৫ হেক্টর। ১০ থেকে ১৫ দিন আগে আমনের চারা রোপণ শেষ হয়েছে। এখন চলছে খেত পরিচর্যার কাজ। কৃষকেরা বলছেন, ধান কাটা ও মাড়াই পর্যন্ত ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে।

কৃষি বিভাগের টাঙানো সরকারি মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়ার দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০, ডিএপি ১ হাজার ৫০ এবং এমওপি ১ হাজার টাকা। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে ১৫ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি, ১০ কেজি এমওপি ও ১ কেজি জিংক ব্যবহারের কথা। তবে বেশি ফলনের আশায় অনেক কৃষক ২০ কেজি পর্যন্ত ইউরিয়া ব্যবহার করছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি তালিকায় দাম নির্ধারিত থাকলেও প্রয়োজনের সময় সবসময় সেই দামে সার পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে অনেককে ডিলার বা খুচরা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এতে বিঘাপ্রতি সার বাবদ খরচ পড়ছে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে কীটনাশকের ব্যয়।

কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমি প্রস্তুত করতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা, চারা ও রোপণে ৫০০, সার বাবদ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০, কীটনাশকে ১ হাজার, আগাছা পরিষ্কারে ১০০, সেচে ১ হাজার ২০০, ধান কাটায় ৪ হাজার, মাড়াইয়ে ৬০০ এবং পরিবহনে প্রায় ৪ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সব মিলিয়ে জমির পত্তন খরচ বাদে এক বিঘা আমন চাষে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার ৭০০ থেকে ১৪ হাজার ২০০ টাকা।

তবে পত্তন নেওয়া জমিতে চাষ করলে কৃষকের ব্যয় আরও বেড়ে যায়। কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের জন্য তিন ফসলি জমি পত্তন নিতে খরচ হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। তিন ফসলের মধ্যে আমনের আনুপাতিক জমি খরচ হিসাব করলে বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ হাজার থেকে ১১ হাজার ৬৭০ টাকা শুধু জমির পেছনেই চলে যায়। ফলে পত্তনসহ এক বিঘা আমন চাষে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৩ হাজার ৭০০ থেকে ২৫ হাজার ৮৭০ টাকা।

কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, বিঘাপ্রতি ১৭ মণ ধান উৎপাদন হলে এবং প্রতি মণ ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি করা গেলে ধান থেকে আয় হবে ২২ হাজার ৯৫০ টাকা। এর সঙ্গে খড় বিক্রি করে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পাওয়া গেলে মোট আয় দাঁড়াতে পারে ২৫ হাজার ৯৫০ থেকে ২৬ হাজার ৯৫০ টাকা।

নিজস্ব জমিতে চাষ করলে এই আয় থেকে উৎপাদন ব্যয় বাদ দিয়ে খড়সহ সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত থাকতে পারে প্রায় ১১ হাজার ৭৫০ থেকে ১৩ হাজার ২৫০ টাকা। তবে এতে কৃষকের নিজের শ্রমের মূল্য ও বাজারদরের ওঠানামার হিসাব ধরা হয়নি।

পত্তন নেওয়া জমির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। একই ফলন ও বাজারদর ধরে পত্তনসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৭০০ থেকে ২৫ হাজার ৮৭০ টাকা। বিপরীতে ধান ও খড় মিলিয়ে সম্ভাব্য আয় ২৫ হাজার ৯৫০ থেকে ২৬ হাজার ৯৫০ টাকা। অর্থাৎ উদ্বৃত্ত থাকতে পারে মাত্র ৮০ টাকা থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা। নিজের শ্রমের মূল্য ও অন্যান্য অনির্ধারিত খরচ ধরলে প্রকৃত লাভ আরও কমে যেতে পারে।

ক্ষেতলালের আমন চাষি আইজুল বলেন, ফলন ভালো দেখা গেলেও চাষের খরচ অনেক বেড়েছে। সার, ওষুধ, জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ ও ধান কাটার খরচ মিলিয়ে বিঘাপ্রতি প্রায় ২৪ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। ১৭ মণ ধান বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করেও হাতে খুব বেশি লাভ থাকে না। নিজের জমি হলে কিছুটা সাশ্রয় হয়, কিন্তু পত্তন নেওয়া জমিতে চাষ করলে লাভের সুযোগ আরও কমে যায়।

কৃষক সোবাহান বলেন, ধানের বর্তমান দাম একেবারে খারাপ না হলেও উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ খুবই কম। তাঁর অভিযোগ, সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সারসহ কৃষি উপকরণ কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে ধান কাটার সময় আরও খরচ যোগ হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত ধান বিক্রি করে কতটা লাভ থাকবে, তা নিয়েই দুশ্চিন্তা।

পত্তন নেওয়া জমিতে আমন চাষ করা কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, এক বছরের জন্য তিন ফসলি জমি পত্তন নিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাগে। এর মধ্যে শুধু আমন ফসলের জন্যই প্রায় ১০ থেকে ১১ হাজার ৬০০ টাকা জমির পেছনে চলে যায়। এরপর সার, কীটনাশক, সেচ, পরিচর্যা, ধান কাটা-মাড়াই ও পরিবহনের খরচ রয়েছে। ধানের ভালো দাম না পেলে তাঁদের মতো পত্তন নেওয়া কৃষকদের টিকে থাকা কঠিন।

কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সারের সরকারি নির্ধারিত মূল্য কার্যকর এবং কৃষকের প্রয়োজনের সময় নির্ধারিত দামে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি চান তাঁরা।

ক্ষেতলাল উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান বলেন, বেশি সার ব্যবহার করলেই বেশি ফলন হবে কৃষকদের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে। অতিরিক্ত সার ব্যবহারে উৎপাদন খরচ বাড়ে। তাই মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত দামে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে বলেও জানান তিনি।