ভোরের আলো ফুটতেই শোনা যায় ডানা ঝাপটানোর শব্দ। একে একে বাসা থেকে উড়ে গাছের ডালে এসে বসে শামুকখোল। কেউ খাবারের সন্ধানে ছুটে যায় চলনবিলের দিকে, আবার কেউ নীড়ে ফিরে বাচ্চার মুখে খাবার তুলে দেয়। সন্ধ্যা নামার আগেই গাছের ডালে ডালে ফের জমে ওঠে পাখিদের মেলা। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুরহাট এলাকায় এখন প্রতিদিনের চিত্র এমনই।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় সাধারণ একটি গ্রাম হিসেবেই পরিচিত ছিল উলিপুরহাট। তবে বর্তমানে পাখিপ্রেমীদের কাছে এটি শামুকখোলের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গ্রামের বড় বটগাছ, ইউক্যালিপটাসসহ বিভিন্ন গাছের ডালে গড়ে উঠেছে শামুকখোলের বাসা। শত শত পাখির কলকাকলিতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুখর থাকে চারপাশ।
উলিপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল খালেক জানান, গ্রামের কাছেই বিস্তৃত চলনবিল। বিলের জলাভূমি ও চরাঞ্চল থেকে শামুকখোলগুলো খাবার সংগ্রহ করে উলিপুরহাটের গাছপালায় ফিরে আসে। চলনবিলের মাছ, জলজ প্রাণী ও অন্যান্য খাদ্য তাদের জীবনধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং গাছের নিরাপদ আশ্রয় দুইয়ের সমন্বয়ে এখানে শামুকখোলের আবাস গড়ে উঠেছে।
তবে খাবার ও আশ্রয়ের পাশাপাশি পাখিদের জন্য নিরাপত্তাও জরুরি। উলিপুর গ্রামের মানুষ নিজেদের উদ্যোগে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। শিকারিরা যাতে পাখি শিকার করতে না পারে, সেদিকে নজর রাখেন স্থানীয়রা। কেউ পাখির বাসার কাছে গিয়ে বিরক্ত করলে কিংবা ঢিল ছুড়লে তাঁরা বাধা দেন।
পাখিদের এই নিরাপদ আবাসস্থলের খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ ক্যামেরা হাতে ছুটে আসেন শামুকখোলের রাজ্য দেখতে। গাছের ডালে সারি সারি পাখি, আকাশে ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলা এবং নীড়ে ফেরার দৃশ্য মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের।
পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালার পরিচালক মাহবুব ইসলাম পলাশ বলেন, একটি পাখির আবাসস্থল টিকে থাকা মানে শুধু পাখি রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পুরো স্থানীয় প্রতিবেশব্যবস্থা। চলনবিলের মতো বিশাল জলাভূমি অঞ্চলে মাছ, শামুক, জলজ উদ্ভিদ, পোকামাকড় ও পাখি সবই একটি খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ। তাই পাখির আবাসস্থল রক্ষা করা হলে একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্যও সুরক্ষিত হয়।
শামুকখোল উলিপুরহাটের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারি প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে পাখি রক্ষায় গ্রামের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
স্থানীয় ও দর্শনার্থীদের ভাষ্য, বটগাছের ডালে যখন শামুকখোলের ঝাঁক বসে, তখন শুধু একটি গ্রামের আকাশই সুন্দর হয় না, সুন্দর হয়ে ওঠে পুরো চলনবিলের প্রকৃতি। মানুষের সচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে উলিপুরহাট আগামী দিনেও শামুকখোলের নিরাপদ নীড় হিসেবে টিকে থাকতে পারে।