“বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই/ কুঁড়েঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই/ আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে/ তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে...”—কবি রজনীকান্ত সেনের কালজয়ী ছড়াটি পাঠ্যবইয়ে এখনও বিদ্যমান থাকলেও, বাস্তবে তার প্রতিচ্ছবি এখন আর চোখেই পড়ে না। একসময় ফরিদপুরের গ্রামগঞ্জে তালের পাতা, ঝাউ আর নারিকেল পাতায় বুক দিয়ে পরম মমতায় বাসা বুনত যে বাবুই পাখি, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের কারণে সেই শৈল্পিক দৃশ্য এখন হারাতে বসেছে।
ফরিদপুরের নয়টি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, আগে প্রায় প্রতিটি মেঠো পথের ধারে, খালের পাড়ে কিংবা ফসলের মাঠের কোণে সারি সারি তাল ও নারিকেল গাছে শোভা পেত বাবুই পাখির ঝুলন্ত বাসা। কিন্তু বর্তমানে গাছ কাটার মহোৎসব ও প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয়ের কারণে শিল্পমনা এ পাখির আবাসস্থল আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে।
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ ও পরিবেশ সচেতনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবেশের নানামুখী বিপর্যয়ই এর প্রধান কারণ। নির্বিচারে তালগাছ, নারিকেল গাছ ও খেজুর গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি ফসলি জমিতে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ব্যবহার এবং প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া বুনো ঘাস ও লতাপাতার ঘাটতি দেখা দেওয়ায় বাবুই পাখির বংশবৃদ্ধি ও বাসা বাঁধার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর এলাকার ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, আগে বর্ষার মৌসুমে গাছে গাছে শত শত বাবুই পাখির বাসায় আলো ঝলমল করতো। ঝড়ের মধ্যেও বাতাসের সঙ্গে দোল খেত নিখুঁত কারুকাজের এসব বাসা। এখন গাঁও-গ্রামে তালগাছই খুঁজে পাওয়া দায়, আর বাবুই পাখির দেখা তো ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সালথা উপজেলার খালেক মোল্যা নামে এক কৃষক জানান, ফসলের পোকা-মাকড় খেয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে ভারসাম্য রক্ষা করতো বাবুই পাখি। কিন্তু এখন জমিতে বিষাক্ত কীটনাশক দেওয়ায় এ পাখিগুলো খাদ্য সংকটে পড়ছে এবং মারাও যাচ্ছে।
এব্যাপারে ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং পরিবেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাবুই পাখির ভূমিকা অপরিসীম। ক্ষতিকারক পোকা খেয়ে এরা কৃষকের অনেক উপকার করে। আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি যেন তারা জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার না করেন এবং বাসস্থানের জন্য ক্ষতিকর গাছ কাটার বিষয়ে সচেতন হন।
ফরিদপুরের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৃক্ষনিধন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বাবুই পাখির আবাস্থল চরম হুমকির মুখে পড়েছে। মূলত তালগাছই এদের প্রধান আশ্রয়স্থল। কিন্তু গাছ কাটার কারণে এরা প্রজনন কেন্দ্র হারাচ্ছে। বাবুই পাখি পরিবেশের পরম বন্ধু ও প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে কাজ করে। এদের রক্ষা করতে আমরা সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় বেশি করে তাল ও নারিকেল চারা রোপণে স্থানীয়দের উৎসাহিত করছি।
পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে একসময় চিত্রশিল্পী হিসেবে খ্যাত বাবুই পাখি ও তার সুনিপুণ বাসা তৈরির গল্প কেবল বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বাবুই পাখির কিচিরমিচির গান ও নান্দনিক বাসা টিকিয়ে রাখতে এখনই তালগাছ রোপণসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
পরমাণু কর্মসূচিতে ইরান ‘অমান্যকারী’ দেশ: আইএইএ
রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫৪২
‘ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার আমলের ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার’