পাখির কলকাকলিতে জেগে উঠেছে চলনবিল

শীত এখনো পুরোপুরি জেঁকে বসেনি। হেমন্তের নরম রোদ আর মৃদুমন্দ বাতাসের ছোঁয়ায় নাটোরের চলনবিলজুড়ে শুরু হয়েছে প্রকৃতির এক অপরূপ আয়োজন। বিস্তীর্ণ জলরাশি, সবুজের সমারোহ আর নীল আকাশের ক্যানভাসে ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি। তাদের কলকাকলি, ডানার ঝাপটানি আর পানিতে অবাধ বিচরণে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে চলনবিল।

কখনো অগভীর পানিতে ঠোঁট ডুবিয়ে খাবারের সন্ধান, কখনো বিলের কিনারে সার বেঁধে বসে থাকা, আবার কখনো দল বেঁধে আকাশের বুকে উড়ে চলা—পাখিদের এমন বিচিত্র কাণ্ডকারখানায় মুগ্ধ হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীরা। জল আর আকাশের মিতালিতে চলনবিল হয়ে উঠেছে প্রকৃতির এক জীবন্ত চিত্রপট।

তবে এই মুগ্ধতার মাঝেও রয়ে গেছে বিষণ্নতার আশঙ্কা। অবৈধ পাখি শিকার, জলাভূমির ক্রমসংকোচন আর পানির স্বল্পতা বিপন্ন করে তুলছে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়। প্রকৃতির এই অনিন্দ্যসুন্দর আয়োজন কত দিন অমলিন থাকবে, সেই প্রশ্নও তাই উঁকি দিচ্ছে সচেতন মানুষের মনে।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সরেজমিনে চলনবিলে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জলাভূমির বিভিন্ন স্থানে পাখিদের অবাধ বিচরণ। সাদাবক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, ডাহুক, গাংচিল, কাঁদাখোঁচা ও শামুকখোলসহ নানা প্রজাতির পাখির উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছে বিলের চারপাশ।

কোথাও সাদা বকের সারি, কোথাও পানির ওপর ভেসে থাকা হাঁসের দল, আবার কোথাও খাবারের খোঁজে ব্যস্ত পানকৌড়ি। নীল আকাশের নিচে তাদের উড়ে চলা আর জলরাশিতে ছায়া ফেলে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছে। পাখির কলকাকলি মিশে যাচ্ছে বাতাসের মৃদু শোঁ শোঁ শব্দে; মনে হচ্ছে, প্রকৃতি নিজেই যেন গুনগুন করে গাইছে আগমনী গান।

শীতের আগমনে দেশের বিভিন্ন জলাভূমিতে পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা বাড়ে। চলনবিলেও শুরু হয়েছে সেই চেনা ঋতুচক্রের আয়োজন। দূরদেশ থেকে আসা পাখিদের পাশাপাশি স্থানীয় জলচর পাখিরাও বিলের পানিতে ও তীরবর্তী এলাকায় খাবার খুঁজছে। তাদের উপস্থিতিতে জলাভূমির স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পাখিদের এই সমাবেশ শুধু চোখের আরাম নয়; এটি জলাভূমির জীববৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা রয়েছে। তাই পাখির নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা মানে শুধু সৌন্দর্য রক্ষা নয়, পরিবেশের সুস্থতাকেও আগলে রাখা।

চলনবিল পরিবেশ উন্নয়ন ও প্রকৃতি সংরক্ষণ ফোরামের সভাপতি জুলহাস কায়েম বলেন, প্রতিবছর শীতের আগমনে দেশের বিভিন্ন জলাভূমিতে পরিযায়ী পাখিরা আসতে শুরু করে। চলনবিলেও ইতিমধ্যে নানা প্রজাতির পাখির দেখা মিলছে। খাবারের সন্ধানে তারা কখনো পানিতে, কখনো বিলের তীরে বিচরণ করছে।

তবে জলাভূমি সংকুচিত হওয়া, পানির স্বল্পতা ও অবৈধ পাখি শিকার তাদের নিরাপদ বিচরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি।

জুলহাস কায়েমের মতে, পাখিদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে জলাভূমি সংরক্ষণের পাশাপাশি শিকার বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এ কাজে স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করাও জরুরি। কারণ, প্রকৃতিকে রক্ষার দায়িত্ব শুধু প্রশাসন বা পরিবেশকর্মীদের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এলাকার প্রতিটি মানুষের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ।

স্থানীয় যুবক এবি সিদ্দিক, আবু সাইদ ও রাজু আহমেদও মনে করেন, অতিথি পাখি চলনবিলের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। তাঁদের মতে, পাখিদের নিরাপদ বিচরণের জন্য চলনবিলে অভয়াশ্রম গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি অবৈধ শিকার বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

প্রকৃতির এই অতিথিদের আগমন যতটা আনন্দের, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও ততটাই বাস্তব। জলাভূমি সংকুচিত হলে এবং খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকট বাড়লে পাখিদের স্বাভাবিক বিচরণ বাধাগ্রস্ত হয়। তার ওপর অবৈধ শিকার তাদের অস্তিত্বের জন্য বাড়তি হুমকি তৈরি করে।

পাখি রক্ষায় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি প্রশাসনও কাজ করছে। অবৈধ শিকার বন্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি সিংড়ায় পরিবেশকর্মীদের অভিযানে পাখি শিকারের অপরাধে আটজনকে অর্থদণ্ড ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ সময় পাঁচটি বক উদ্ধার করা হয়। পরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে পাখিগুলো অবমুক্ত করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল রিফাত।

ইউএনও আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাখি শিকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত আছে। আইন অমান্য করে পাখি শিকার করলে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ডসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশাসনের এমন উদ্যোগ পাখি সংরক্ষণে আশার আলো দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে নিয়মিত নজরদারি, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা এবং জলাভূমি রক্ষার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

নাটোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম আনু বলেন, চলনবিল এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের আধার। অতিথি পাখি রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। পাখি শিকার বন্ধ, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং পাখির নিরাপদ আবাসস্থল তৈরিতে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

চলনবিলের সৌন্দর্য কেবল তার জলরাশিতে নয়; এর সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে কাশবন, সবুজ প্রান্তর, জলজ উদ্ভিদ আর পাখিদের নির্ভার বিচরণে। ভোরের আলোয় ডানার ঝাপটানি, দুপুরের রোদে পানির ওপর ভেসে থাকা পাখির সারি কিংবা গোধূলির আকাশে ঝাঁক বেঁধে ফিরে যাওয়ার দৃশ্য—সব মিলিয়ে চলনবিল যেন প্রকৃতির লেখা এক দীর্ঘ কবিতা।

কিন্তু সেই কবিতার পঙ্‌ক্তি যদি একে একে হারিয়ে যায়, যদি শিকারির ফাঁদে নিভে যায় পাখির প্রাণ, যদি পানির অভাবে শুকিয়ে আসে তাদের আশ্রয়, তবে চলনবিলের সৌন্দর্যও একদিন ম্লান হয়ে পড়বে।

তাই পাখির কলকাকলি ধরে রাখতে হলে শুধু তাদের আগমনে মুগ্ধ হলেই চলবে না; রক্ষা করতে হবে তাদের আবাস, বন্ধ করতে হবে অবৈধ শিকার, ফিরিয়ে আনতে হবে জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ। প্রকৃতির অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই চলনবিলের আকাশে ডানা মেলে উড়বে জীবনের গান—আর জলরাশির বুকে বেঁচে থাকবে বাংলার অপরূপ প্রকৃতির এক অনন্য অধ্যায়।