লালমনিরহাটে রাজকীয় আয়োজনে সাত জোড়া গণবিয়ে

সমাজ থেকে যৌতুক প্রথার মতো সামাজিক ব্যাধি নির্মূলে ব্যতিক্রমী ও অনুকরণীয় উদ্যোগের সাক্ষী হলো লালমনিরহাট। যৌতুকের পরিবর্তে ভালোবাসা, সম্মান ও পারিবারিক বন্ধনকে প্রাধান্য দিয়ে একই মঞ্চে সাত জোড়া তরুণ-তরুণীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। কোনো ধরনের যৌতুক ছাড়াই জাঁকজমকপূর্ণ ও রাজকীয় পরিবেশে আয়োজিত এই গণবিয়ের আয়োজন করে সামাজিক সংগঠন ‘আলোকিত লালমনিরহাট’।

শুক্রবার (৩ জুলাই) রাতে লালমনিরহাট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এ ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে ছয়টি মুসলিম ও একটি হিন্দু পরিবারের মোট সাত জোড়া নবদম্পতি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে সম্পন্ন হওয়া এই গণবিয়ে পরিণত হয় সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সামাজিক সচেতনতার এক অনন্য উৎসবে।

ঝলমলে আলোকসজ্জা, নান্দনিক সাজসজ্জা আর উৎসবমুখর পরিবেশে মিলনায়তনটি যেন রূপ নেয় এক বর্ণিল মিলনমেলায়। একই রঙের শেরওয়ানিতে সুসজ্জিত বর এবং লাল শাড়িতে সেজে ওঠা কনেদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। নবদম্পতিদের পাশাপাশি তাদের স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অতিথিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর আবেগঘন মুহূর্ত।

নবদম্পতিরা বলেন, যৌতুকের বোঝা নয়, পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সম্মানের ভিত্তিতেই একটি সুখী পরিবার গড়ে ওঠে। তারা সমাজের সব তরুণ-তরুণীকে যৌতুকবিহীন বিয়েতে উৎসাহিত হওয়ার আহ্বান জানান এবং নতুন জীবনের জন্য সবার দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করেন।

আয়োজকেরা জানান, গত ঈদুল আজহার সময় ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ গড়ার প্রত্যয়ে যৌতুকবিহীন গণবিয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার রাতে সেই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ পেল। ভবিষ্যতেও এমন সামাজিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনার কথাও জানান তারা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান এবং পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান। তারা বলেন, যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধি দূর করতে এ ধরনের উদ্যোগ সময়োপযোগী, প্রশংসনীয় এবং অনুকরণীয়। এতে তরুণ সমাজের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে পড়বে এবং যৌতুকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এবং ‘আলোকিত লালমনিরহাট’-এর রূপকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘যুবসমাজ যদি নিজ উদ্যোগে যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই সামাজিক অভিশাপ দূর করা সম্ভব। একটি কুসংস্কারমুক্ত, বৈষম্যহীন ও আলোকিত সমাজ গঠনে তরুণদেরই নেতৃত্ব দিতে হবে।‘

তার বক্তব্যে উঠে আসে পরিবর্তনের প্রত্যয়, সচেতনতার বার্তা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের আহ্বান।

লালমনিরহাটের এই বর্ণাঢ্য গণবিয়ে শুধু সাতটি পরিবারের নতুন পথচলার সূচনা নয়; এটি যৌতুকমুক্ত সমাজ গঠনের এক শক্তিশালী সামাজিক অঙ্গীকার। ভালোবাসা, সম্মান ও মানবিক মূল্যবোধকে সামনে রেখে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।