ভরা বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে আমনখেত থাকার কথা পরিপূর্ণ। কিন্তু দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে চিত্রটা উল্টো। প্রায় এক মাস ধরে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি না হওয়ায় উঁচু জমিগুলো শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে। পানির অভাবে আমনের চারা বিবর্ণ হয়ে পড়ছে, থমকে যাচ্ছে স্বাভাবিক বৃদ্ধি। ফসল রক্ষায় কৃষকদের এখন বাড়তি টাকা খরচ করে শ্যালো মেশিন ও গভীর নলকূপের পানি দিতে হচ্ছে। এতে আমন চাষে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ফলন ও লাভ নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আমনের চারা রোপণ প্রায় শেষ হলেও অধিকাংশ উঁচু জমিতে পানির সংকট তৈরি হয়েছে। নিচু জমিতে সামান্য পানি থাকলেও উঁচু জমির মাটি শুকিয়ে ফাটল ধরেছে। কোথাও কৃষক শ্যালো মেশিন বসিয়ে জমিতে পানি দিচ্ছেন, আবার কোথাও সেচের ব্যবস্থা করার প্রস্তুতি চলছে। বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকা কৃষকদের অনেকেই বলছেন, বৃষ্টি না হলে প্রতি বিঘা জমিতে সেচের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আমন মৌসুমে সাধারণত বৃষ্টির পানির ওপরই সেচের বড় অংশ নির্ভর করে। কিন্তু এবার শ্রাবণ মাসেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে। বিশেষ করে উঁচু জমির কৃষকদের বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে। বৃষ্টি না হলে সেচের জন্য বাড়তি খরচের পাশাপাশি ডিজেল ও শ্রমিকের ব্যয়ও বাড়বে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে আমন চাষে লাভ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ফুলবাড়ী পৌরসভাসহ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ১৮ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জমি থেকে ৯১ হাজার ৩১১ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে সেচের ওপর চাপ বাড়বে। এতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এলুয়াড়ী ইউনিয়নের বারাইপাড়া গ্রামের কৃষক মদন চন্দ্র রায় ৬ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। অনাবৃষ্টিতে তাঁর জমিও শুকিয়ে ফেটে গেছে। ফসল রক্ষায় তিনি নিয়মিত সেচ দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘জমিতে পানি না থাকায় সেচ দিতে হচ্ছে। সেচ দিয়ে চাষাবাদ করলে খরচ তোলা মুশকিল হয়ে যাবে। বর্তমান বাজারে ডিজেলের দাম অনেক বেশি। তাই সেচের খরচও বেশি পড়ছে। এখন লোকসানের চিন্তা করলে ঘরে আর ফসল তোলা সম্ভব হবে না। তাই বাধ্য হয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। বাকিটা ঈশ্বরের ভরসা।’
শিবনগর ইউনিয়নের পলিশিবনগর গ্রামের কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক ও শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘চারা রোপণের পর থেকেই বৃষ্টির অভাবে শ্যালো মেশিন চালিয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচ হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়তে হবে। অনাবৃষ্টির কারণে মাঠঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।’
ফুলবাড়ী উপজেলার কাঁটাবাড়ী কৃষক সমবায় সমিতির সভাপতি মোস্তাক আহমেদ বলেন, শুধু শ্যালো মেশিনের ওপর নির্ভর না করে গভীর নলকূপও চালু করা হয়েছে। কৃষকদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ আগস্ট থেকে এটি চালু করা হয়। অনাবৃষ্টির কারণে ফসলহানির আশঙ্কায় কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তাঁদের চাহিদার কথা বিবেচনা করেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
স্কুলশিক্ষক আনোয়ার সাদাত মন্ডল বলেন, ‘বৃষ্টির অভাবে ফসলের মাঠগুলো শুকিয়ে আসছে। বাধ্য হয়ে কৃষকেরা শ্যালো মেশিন ও গভীর নলকূপ চালিয়ে জমিতে পানি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আমার ২ বিঘা জমিতেও পানি দেওয়া শুরু করেছি।’
দিনাজপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ১২ জুলাই সকাল ৬টা ১ মিনিট থেকে ১৩ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত দিনাজপুরে ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। এরপর ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ভারী কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। চলতি মাসের চতুর্থ সপ্তাহের দিকে একটি লঘুচাপের সম্ভাবনা রয়েছে। তখন হালকা বৃষ্টি হতে পারে। এর আগে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কম।
ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফ আব্দুল্লাহ বলেন, উপজেলার ১৮ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ করছেন কৃষকেরা। ইতোমধ্যে চারা রোপণের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় মাঠগুলো শুকিয়ে আসছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রয়োজন হলে বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় গভীর নলকূপ চালুর ব্যবস্থা করা হবে।
ফুলবাড়ী বরেন্দ্র সেচ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাছান বলেন, শ্রাবণেও বৃষ্টিপাত না হওয়ায় তীব্র রোদে খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে পানির ব্যবস্থা করা হবে। গভীর নলকূপগুলো চালুর বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।