চার দশকের মুয়াজ্জিনকে ঘোড়ার গাড়িতে বিদায়

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একই মসজিদ থেকে ভেসে এসেছে তার কণ্ঠের আজান। সেই পরিচিত ধ্বনির সঙ্গে রংপুরের গুপ্তপাড়া এলাকার বহু মানুষের জড়িয়ে গেছে অসংখ্য স্মৃতি। ৪১ বছর দায়িত্ব পালনের পর সেই প্রিয় মুয়াজ্জিন মো. আবু তাহেরকে এবার বিদায় জানালেন মুসল্লি ও এলাকাবাসী। তবে সাধারণ কোনো বিদায় নয়সম্মাননা দেওয়ার পর সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে বসিয়ে পুরো এলাকা ঘুরিয়ে তাকে বিদায় জানানো হয়।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বাদ জুমা নগরীর গুপ্তপাড়া ওয়াকফ জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে আবু তাহেরের বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। দীর্ঘদিনের পরিচিত এই মানুষটির বিদায়ে মসজিদ প্রাঙ্গণে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। মুসল্লি ও স্থানীয়দের অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, কণ্ঠে ছিল তার জন্য দোয়া ও শুভকামনা।

৬৫ বছর বয়সী আবু তাহের ৪১ বছর ধরে গুপ্তপাড়া ওয়াকফ জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান দেওয়ার পাশাপাশি মসজিদের বিভিন্ন দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। তার কণ্ঠের আজান শুনেই বছরের পর বছর নামাজের জন্য মসজিদে এসেছেন এলাকার মানুষ।

বিদায় সংবর্ধনা শেষে শুরু হয় ব্যতিক্রমী বিদায়যাত্রা। সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে আবু তাহেরকে বসিয়ে মুসল্লি ও এলাকাবাসী তাকে সঙ্গে নিয়ে গুপ্তপাড়া এলাকা প্রদক্ষিণ করেন। এমন আয়োজন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি হয় উৎসব ও আবেগের আবহ।

মসজিদের সেক্রেটারি মমতাজ জাহির আহমেদ বলেন, চার দশকের বেশি সময় ধরে আবু তাহের মসজিদটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা এই মানুষটিকে বিদায় দিতে গিয়ে তাদের কষ্ট হচ্ছে। তার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন তিনি।

মসজিদের ইমাম ও খতিব আলহাজ মাওলানা রবিউল ইসলাম বলেন, প্রায় ২৭ বছর ধরে তিনি এই মসজিদে দায়িত্ব পালন করছেন। এর দীর্ঘ একটি সময় আবু তাহেরকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছেন। অসংখ্য নামাজ, আজান ও স্মৃতির সঙ্গে তিনি জড়িয়ে আছেন। বিদায়ের মুহূর্তটি তার জন্য আবেগের হয়ে উঠেছে বলেও জানান তিনি।

আবু তাহেরের স্থলাভিষিক্ত হয়ে বর্তমানে মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন হাফেজ মো. মেরাজুল ইসলাম (২০)। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৪১ বছর দায়িত্ব পালন করে আবু তাহের চাচার সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেওয়া তার জন্য অনুপ্রেরণার। তিনিও যেন নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের নামাজের আহ্বান জানাতে পারেন এবং একদিন একইভাবে সম্মানের সঙ্গে বিদায় নিতে পারেন—এটাই তার প্রত্যাশা।

এদিকে আবু তাহেরের অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা সংগ্রহ করে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়।

বাংলার চোখ স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের চেয়ারম্যান আলহাজ তানভীর হোসেন আশরাফী বলেন, একটি মসজিদে টানা ৪১ বছর দায়িত্ব পালন করা নিঃসন্দেহে দীর্ঘ ও সম্মানের বিষয়। এলাকাবাসী যেভাবে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকে বিদায় জানিয়েছেন, তা সামাজিক মূল্যবোধের সুন্দর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

বিদায়ী মুয়াজ্জিন আবু তাহের বলেন, ৪১ বছর এই মসজিদে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মসজিদ ও এখানকার মানুষ তার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বিদায়ের দিনে সবাই যে ভালোবাসা ও সম্মান দেখিয়েছেন, তা তিনি কখনো ভুলবেন না। এত মানুষের ভালোবাসা পাওয়াকেই জীবনের বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন তিনি। সবার কাছে নিজের জন্য দোয়া চান আবু তাহের।

আয়োজকেরা জানান, দীর্ঘ ৪১ বছরের দায়িত্বের সমাপ্তিকে স্মরণীয় করে রাখতেই ঘোড়ার গাড়িতে করে তাকে বিদায় জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। একজন মুয়াজ্জিনকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন প্রবীণকে সম্মান জানানোই ছিল এই আয়োজনের উদ্দেশ্য।

বিদায় সংবর্ধনায় মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা মো. রবিউল ইসলাম, আয়োজক আমিন মিয়া, এলাকাবাসীর পক্ষে মোহাম্মদ মশিউর রহমান প্রিন্সসহ মসজিদ কমিটির সদস্য, মুসল্লি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

৪১ বছর ধরে যে কণ্ঠে গুপ্তপাড়ার মানুষ নামাজের আহ্বান শুনেছেন, সেই কণ্ঠের নিয়মিত আজান আর শোনা যাবে না। তবে ঘোড়ার গাড়িতে ব্যতিক্রমী এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে আবু তাহেরের দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতি আরও গভীরভাবে গেঁথে গেল স্থানীয় মানুষের মনে।