দুর্নীতির ‘বরপুত্র’ বেনজীরের দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড়

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি এবং ভয় দেখিয়ে সম্পদ অর্জনের যে অবিশ্বাস্য কাহিনী একে একে উন্মোচিত হচ্ছে, তা রূপকথাকেও হার মানায়। পুলিশে থাকাকালীন সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলার ভয় দেখানো, সহকর্মীদের ওপর মাসিক আয়ের টার্গেট চাপিয়ে দেওয়া, বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল তার নিত্যদিনের ঘটনা। 

ক্ষমতার দাপটে রাতের আঁধারে অন্যের জমি দখল করে তিনি গড়ে তুলেছেন প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার এক বিশাল সাম্রাজ্য। নামে-বেনামে গড়ে তোলা এই অবৈধ সম্পদের তালিকায় রয়েছে বিলাসবহুল রিসোর্ট, আলিশান বাড়ি, পাঁচ তারকা হোটেলের শেয়ার, ইটভাটা, পোল্ট্রি খামার এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শত শত বিঘা জমি। কখনো নিজের নামে, আবার কখনো স্ত্রী, শ্যালক বা শাশুড়ির নামে এসব সম্পত্তি লিখে রাখলেও শেষ রক্ষা তার হয়নি। অতি গোপনে দেশ ছাড়ার পর একের পর এক দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে আসতে থাকে এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখে অবশেষে দুবাইয়ে গ্রেফতার হতে হয় সাবেক এই প্রভাবশালী পুলিশ প্রধানকে।

বেনজীর ২০১০ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ছিলেন। তার আগে ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত র‍্যাবের মহাপরিচালক এবং পরে ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল  আইজিপি হন। ছিলেন ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। পরে অবসরে যান। 

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে আসে, বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে কেবল বাংলাদেশেই জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৮৫ বিঘা বা ৭৮৬ একর। এই বিশাল সম্পদের উৎস ও অবৈধ লেনদেনের সত্যতা পেয়ে আদালত ২০২৪ সালের মে মাসে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের নামে থাকা ১৯৩টি দলিলের জমি এবং গুলশানের চারটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রোকের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা ৩৩টি হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, ৩টি বিও হিসাব এবং ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করার আদেশ দেওয়া হয়। তবে আইনি জাল চারদিক থেকে ঘিরে ধরার আগেই তিনি ব্যাংক থেকে ১৫ কোটি টাকা তুলে নেন এবং অত্যন্ত চতুরতার সাথে সপরিবারে দেশ ছাড়েন।

বেনজীরের অবৈধ সম্পদের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান নিদর্শন হলো তার নিজের জেলা গোপালগঞ্জের সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই বিনোদন কেন্দ্রটি মূলত বৈরাগীটোল গ্রামের সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে এবং নামমাত্র মূল্য দিয়ে জোরপূর্বক দখল করা জমিতে গড়ে তোলা হয়। কাগজে-কলমে এটি তার স্ত্রীর নামে থাকলেও এর নেপথ্যের কারিগর ছিলেন বেনজীর নিজেই। 

এছাড়া মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার সাতপাড় গ্রামে তার স্ত্রী জিসান মির্জার নামে আরও ২৭৩ বিঘা জমি কেনা হয়, যার রেজিস্ট্রি মূল্যই দেখানো হয়েছিল ১০ কোটি টাকার ওপরে। শুধু নিজস্ব রিসোর্টই নয়, গাজীপুরের ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা সেন্টারেও বেনজীরের ২৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে, যার জন্য তাকে কোনো অর্থই বিনিয়োগ করতে হয়নি, বরং রিসোর্টটি তৈরিতে বন বিভাগের প্রায় চার একর সরকারি জমি দখল করা হয়। এর বাইরে গাজীপুরের কালীগঞ্জে তার পরিবারের নামে রয়েছে আরও ৫০ বিঘা জমি।

পর্যটন নগরী হিসেবে খ্যাত কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের ইনানী সৈকতে এবং দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনেও থাবা বসিয়েছিলেন সাবেক এই আইজিপি। ডিএমপি কমিশনার থাকাকালীন ক্ষমতার জোরে সেন্ট মার্টিনে প্রায় চার বিঘা এবং ইনানী সৈকতে পরিবারের নামে ৭২ শতক মূল্যবান জমি নিজের আয়ত্তে নেন। পাহাড় ঘেরা বান্দরবানের সুয়ালক ও লামা উপজেলায় অন্তত ২৫৭ বিঘা পাহাড়ি জমি রয়েছে তার দখলে। ক্ষমতার হাত বাড়িয়েছিলেন উত্তর ও পূর্বাঞ্চলেও। কিশোরগঞ্জে প্রায় শত বিঘা জমির ওপর স্বাস্থ্য খাতের বিতর্কিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর সাথে যৌথ মালিকানায় গড়ে তোলেন বিশাল খামার। 

একইভাবে ঠাকুরগাঁও সদর এবং নীলফামারীর জলঢাকায় বিতর্কিত ঠিকাদার মিঠুর সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে প্রায় ৫০ বিঘা করে জমির ওপর বিশাল পোল্ট্রি খামার ও মুরগির খাদ্য তৈরির কারখানা গড়ে তোলেন তিনি। অন্যদিকে সাতক্ষীরায় র‌্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালীন ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে এক ব্যক্তির ৪৮ বিঘা জমির ওপর থাকা ইটভাটা রাতের আঁধারে দখল করে তা শ্যালকের হাতে তুলে দেন। এমনকি শাশুড়ির নামেও ওই জেলায় শতাধিক বিঘা জমি দখল করে গড়ে তোলেন বিশাল চারটি মাছের ঘের।

রাজধানীর বুকেও বেনজীর ও তার পরিবারের রাজকীয় জীবনযাপনের চিত্র ফুটে ওঠে তাদের আবাসনে। গুলশান ও বসুন্ধরার মতো অভিজাত এলাকায় পাঁচটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং উত্তরা ও ভাটারা এলাকায় দুটি দৃষ্টিনন্দন সাততলা বাড়ির সন্ধান মিলেছে, যার বাজারমূল্য অন্তত ৭৫ কোটি টাকা। তার দুই মেয়ে দামি গাড়ি এবং আলিশান ফ্ল্যাটে বিলাসী জীবন কাটাতেন। ২০১৯ সালে র‌্যাবের প্রধান থাকাকালীন বেনজীর তার দুই মেয়ের নামে বেস্ট হোল্ডিংস তথা পাঁচ তারকা হোটেল লা মেরিডিয়েনের দুই লাখ শেয়ার কিনে দেন। দেশের অভ্যন্তরে সম্পদের এই বিশাল বলয় তৈরি করেই শান্ত হননি তিনি। অর্থ পাচারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নিজের নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছিলেন। 

দুদক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, বাংলাদেশ ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ে বেনজীরের অঢেল সম্পদ ও আবাসন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম সুবিধা এবং দুবাইয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার তথ্য মিলেছে। দেশ ছেড়ে পালিয়ে দুবাইয়ে আশ্রয় নিলেও শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইন ও অপরাধের দায় থেকে রেহাই পাননি দুর্নীতির এই বরপুত্র।