শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফল ভালো করতে যেসব ‘অবৈধ কৌশল’ এখন আলোচনায়

একদিকে সারাদেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল যখন প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ, অন্যদিকে নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শতভাগ শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ পাওয়ার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। 

বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। সাত কর্মদিবসের মধ্যে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী, ভর্তি-সংক্রান্ত নথি, নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী এবং এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণকারীদের তথ্য চাওয়া হয়েছে।

একসময় পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করা হতো। এর ফলে খাতা মূল্যায়নের সময় সহানুভূতিশীল বা মানবিক বিবেচনায় নম্বর দেওয়ার প্রবণতাও ছিল। সে সময়ে কোনো স্কুল বা কলেজ ভালো ফল কিংবা শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জন করলে তা নিয়ে তেমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বা সন্দেহের আলোচনা হতো না। বরং ভালো ফলাফলকে প্রতিষ্ঠানের সাফল্য হিসেবেই দেখা হতো।

তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরীক্ষায় নকল এবং সহানুভূতি বা মানবিক বিবেচনায় অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার প্রবণতা বন্ধে কঠোরতা আরোপ করা হয়। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতেও নেওয়া হয় কঠোর নজরদারি। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরীক্ষাকেন্দ্র ‘কেনা’ কিংবা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ভালো ফল করার অভিযোগ ও আলোচনা রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন হলেও শিক্ষা অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত কথিত কৌশলগুলো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থী বাছাই, দুর্বল শিক্ষার্থীকে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, নির্বাচনী পরীক্ষায় ‘ফিল্টারিং’ এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনার মতো নানা অভিযোগ।

রেজিস্ট্রেশন থেকেই শুরু হয় ‘ফিল্টারিং’?

এসএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এ সময় একজন শিক্ষার্থী কোন প্রতিষ্ঠানের অধীনে বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেবে, তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়। শিক্ষা বোর্ডের নথিতেও নবম শ্রেণির নিবন্ধন এবং পরবর্তী সময়ে টিসির মাধ্যমে শিক্ষার্থী স্থানান্তরের বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে।

এক্ষেত্রে শিক্ষা অঙ্গনে আলোচিত একটি সম্ভাব্য কৌশল হলো—কোনো প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও তাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা এবং পরীক্ষার সময় তুলনামূলকভাবে ভালো শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের মোট শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত মান নয়, বরং শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার্থী হিসেবে থাকা শিক্ষার্থীদের ফলাফলই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড হয়ে উঠে।

নির্বাচনী পরীক্ষা

ফলাফল নিয়ে প্রশ্নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষা। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা টেস্ট পরীক্ষায় ভালো ফল করতে না পারলে তাদের এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। 

সহজ একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। একটি প্রতিষ্ঠানে দশম শ্রেণিতে ২০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫০ জন ভালো ফল করার মতো অবস্থায় এবং ৫০ জন তুলনামূলক দুর্বল। শেষ পর্যন্ত যদি ওই ১৫০ জনই এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং তারা সবাই ভালো ফল করে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ সাফল্য দেখাতে পারে। কিন্তু সেই ফলাফল কি পুরো ২০০ শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত অবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে? এখানেই তৈরি হয় মূল প্রশ্ন।

শিক্ষার্থী স্থানান্তর

কোন কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত হওয়ার পর অপেক্ষাকৃত খারাপ শিক্ষার্থীদের পরবর্তী সময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। এসব কারণে ভালো শিক্ষার্থীরাই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। 

অবশ্য স্বাভাবিক কারণেও শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে পারে। পারিবারিক স্থানান্তর, বাসস্থান পরিবর্তন, আর্থিক সমস্যা কিংবা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সিদ্ধান্ত—এসব কারণেও শিক্ষার্থীরা টিসি নিতে পারে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি ধারাবাহিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরাই অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যায় এবং ভালো ফল করার সম্ভাবনা থাকা শিক্ষার্থীরা থেকে যায় তাহলে এ ববিষয়টি পরীক্ষায় ভালো ফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

এইচএসসিতেও একই প্রশ্ন

এসএসসির মতো এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ও রেজিস্ট্রেশন গুরুত্বপূর্ণ। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী কোন কলেজের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে, তার ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে টিসির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ব্যবস্থাও রয়েছে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর নিয়মিত নোটিশেও একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের টিসি, ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশনসংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রমের উল্লেখ থাকে।

তাই কোনো কলেজের ফলাফল যদি অস্বাভাবিকভাবে ভালো হয়, সেখানেও একই ধরনের প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—একাদশ শ্রেণিতে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল, কতজন রেজিস্ট্রেশন করেছিল, কতজন পরবর্তী সময়ে অন্য কলেজে চলে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত কতজন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে?

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মো. রহমত উল্লাহ  বলেন খবর সংযোগকে বলেন, বাংলাদেশে ভালো স্কুল হিসেবে খ্যাতি আছে—এমন প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই বাছাই করে ভর্তি এবং ছাঁটাই করে অপেক্ষাকৃত ভালো শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এ-প্লাস পাওয়ার একটি অশুভ প্রক্রিয়ার অভিযোগ রয়েছে। 

অনেক অভিভাবকও ভালো ফলের আশায় এ প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করেন। আমাদের পরীক্ষা-নির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থা মূলত পরীক্ষাভিত্তিক। 

অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা যায় ক্লাসে শিক্ষার্থী কম, কিন্তু পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। এর কারণ হচ্ছে ক্লাসে স্টুডেন্ট না থাকলেও পরীক্ষার সময় অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে বসে। এসব কাজে বিপুল পরিমাণ অর্থিক লেনদেনও হয়ে থাকে।

এসব অনিয়ম দূর করতে হলে যখন ভর্তি করে রেজিস্ট্রেশন করে রাখা হবে, তখন নির্বাচনী পরীক্ষায় কতজনকে বাদ দিলেন, সেটারও একটি হিসাব রাখতে হবে।

শতভাগ জিপিএ-৫ নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ ফলাফল। কিন্তু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ করতে শুধু পরীক্ষার ফলাফলই যথেষ্ট কি না, সেটিও এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।