প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে জবিতে ‘গরুভোজ’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার বিষয়ে প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে গরু জবাই করে ভোজের আয়োজন করেছেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে উপাচার্যের ভবন ও গণিত বিভাগের মধ্যবর্তী সড়কে পূর্বঘোষিত এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গরু জবাই করা হয়। আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, দুপুরের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে খিচুড়ি ও গরুর মাংস বিতরণ করা হবে।

‘জবিয়ানদের গরুভোজ’ নামের এ কর্মসূচির জন্য গত বৃহস্পতিবার ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় একটি গরু কেনা হয়। শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন থেকে পাওয়া অর্থ এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তির অনুদানে গরুটি কেনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মাসুদ রানা।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গরুটি ক্যাম্পাসে আনার পর আনন্দমিছিল করেন কর্মসূচির আয়োজকেরা। এ সময় গরু খাওয়ার অধিকার এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচিতে অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের জন্য ৭০ টাকা নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক আজম খান বলেন, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে পশু জবাই নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিজ্ঞপ্তিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে মার্জিত ও সুশৃঙ্খলভাবে গরুভোজের আয়োজন করা হলে তাঁদের কোনো আপত্তি থাকবে না।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ অক্টোবর রাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী অনার্স শেষ করার উপলক্ষ হিসেবে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের কাছে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন। ওই স্থানের কাছেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির অবস্থিত। রান্নার আয়োজন নিয়ে আপত্তি জানান কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী। তাঁদের অভিযোগ, মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করায় তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। এ ছাড়া চুলা তৈরিতে মন্দিরের ইট ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে। এর প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা।

তবে রান্নার আয়োজন করা শিক্ষার্থীরা জানান, প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় রান্নার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। সেখানে গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিকল্প হিসেবে কাঠের চুলায় রান্নার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ইটগুলো মন্দিরের বলে জানতে পেরে সেগুলো সরিয়ে ক্যাফেটেরিয়া থেকে লোহার চুলা আনা হয়। অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য তাঁরা দুঃখ প্রকাশ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রক্টরের হস্তক্ষেপে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টির সমাধান হয়েছিল। পরদিনও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়। তবে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যাম্পাসে এ নিয়ে আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা দেয়।

এরপর ১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর থেকে ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখার কথা উল্লেখ করা হয়। নির্দেশনা অমান্য করা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।

বিজ্ঞপ্তির পর শিক্ষার্থীদের একাংশ অভিযোগ করেন, এ ধরনের নির্দেশনা তাঁদের খাদ্যাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকারে হস্তক্ষেপের শামিল। এর প্রতিবাদে বুধবার রাতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে জকসু। সেখান থেকে বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার, প্রশাসনের প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ, ঘটনার তদন্ত, ক্যাফেটেরিয়ায় গরু ও খাসির মাংসের ব্যবস্থা এবং ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সম্প্রীতি নিশ্চিত করাসহ চার দফা দাবি জানানো হয়।

জকসুর নেতারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রশাসনকে দুঃখ প্রকাশের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শুক্রবার গরু জবাই করে ভোজের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। নির্বাচিত জকসু কমিটির ভিপি, জিএসসহ অধিকাংশ সদস্য ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

এদিকে বিজ্ঞপ্তি নিয়ে সমালোচনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে দুঃখ প্রকাশ করে। জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তরের মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে প্রশাসন জানায়, ক্যাম্পাসে পশু জবাইসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের অধিকার সবার রয়েছে। তবে কোনো আয়োজন যেন অন্যের অনুষ্ঠান বা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির অবনতি এড়াতেই প্রক্টরের পক্ষ থেকে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। ওই অনুরোধকে কেন্দ্র করে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়ায় প্রশাসন দুঃখ প্রকাশ করছে।

প্রশাসনের ব্যাখ্যা ও দুঃখ প্রকাশের পরও পূর্বঘোষিত ‘গরুভোজ’ কর্মসূচি অব্যাহত রাখে জকসু।