হলিউডে রেকর্ড গড়লো সিডনির সিনেমা

এইচবিওর সিরিজ ‘ইউফোরিয়া’ দিয়ে খ্যাতি পাওয়া ২৮ বছর বয়সী অভিনেত্রীর বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ২০২৫ সালে অম্লমধুর অভিজ্ঞতা হয়েছে সিডনির। এক সিনেমা ডাহা ফ্লপ করলেও আরেকটি স্বস্তি ফিরিয়েছে।

নারীকেন্দ্রিক মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘দ্য হাউসমেইড’, যেখানে অভিনয় করেছেন সিডনি সুইনি ও আমান্ডা সেফ্রিড- ইতিমধ্যেই ‘ব্রাইডসমেইডস’- কে ছাড়িয়ে গিয়ে নির্মাতা পল ফিগের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমায় পরিণত হয়েছে।

গত বছরের শেষের ছুটির মৌসুম শুরু হওয়ার সময় হলিউডে খুব কম মানুষই পরিচালক পল ফিগের ‘দ্য হাউসমেইড’ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন; বরং আলোচনায় ছিল সিনেমাটির তারকা সিডনি সুইনিকে ঘিরে আমেরিকান ঈগল জিনসের একটি বিজ্ঞাপন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া বিতর্ক। ফ্রেইডা ম্যাকফ্যাডেনের একই নামের বেস্টসেলার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে সুইনির সঙ্গে অভিনয় করেছেন আমান্ডা সেফ্রিড ও ব্র্যান্ডন স্কলেনার। এখন অবশ্য পরিস্থিতি বদলে গেছে।

নতুন মাইলফলক

২৩ থেকে ২৫ জানুয়ারির সপ্তাহান্তে ‘দ্য হাউজমেইড’ বিশ্বজুড়ে টিকিট বিক্রি থেকে আয় করেছে ২৯৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার। এতে এটি পল ফিগের ক্যারিয়ারের আগের রেকর্ডধারী ‘ব্রাইডসমেইডস’–কে (২৮৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়ে গেছে। মুদ্রাস্ফীতির হিসাব ছাড়াই এটি ফিগের পরিচালিত সিনেমাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ আয়।

আর রেটেড মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারটি নির্মাণে নেট বাজেট ছিল মাত্র ৪৫ মিলিয়ন ডলার। এই সাফল্য বিশেষভাবে ফিগের জন্য বড় জয়। প্রায় ১৫ বছর আগে, যখন আর—রেটেড কমেডির রমরমা সময়, তখন ‘ব্রাইডসমেইডস’ বানিয়ে তিনি ঘরানার সীমা ভেঙে দিয়েছিলেন, একটি পুরোপুরি নারীকেন্দ্রিক ছবি দিয়ে। ইউনিভার্সালের সেই সিনেমা সে বছর সর্বোচ্চ আয় করা ছবির তালিকায় ছিল ১২ নম্বরে। এটি ২০২৪ সালের আলোচিত বই থেকে সিনেমায় রূপান্তর ‘ইট এন্ডস উইথ আস’-কেও ছাড়িয়ে গেছে, যেটির আয় ছিল ২৫০ মিলিয়ন ডলার।

এই সাফল্য সিডনি সুইনির ক্যারিয়ারেও নতুন মাইলফলক। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে এটিই তাঁর সবচেয়ে বেশি আয় করা ছবি, যা সহজেই ছাড়িয়ে গেছে ‘এনিওয়ান বাট ইউ’-কে (২০৮ মিলিয়ন ডলার)। শুধু তা–ই নয়, ২০২৫ সালের বহু আলোচিত সিনেমা—এমনকি অস্কারের সম্ভাব্য প্রতিযোগী ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’-এর চেয়েও বেশি আয় করেছে ছবিটি। সবকিছুই ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন মহামারির পরও বিশ্ব বক্স অফিস এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অনেক বিশ্লেষকের মতে, মাঝারি বাজেটের ছবি, বিশেষ করে নারীকেন্দ্রিক সিনেমা, বড় পর্দার চেয়ে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের জন্যই বেশি উপযোগী। তবে এই ধারণার সঙ্গে একেবারেই একমত নন পল ফিগ।

কী বললেন নির্মাতা

আর রেটেড মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারটি নির্মাণে নেট বাজেট ছিল মাত্র ৪৫ মিলিয়ন ডলার। এই সাফল্য বিশেষভাবে ফিগের জন্য বড় জয়। প্রায় ১৫ বছর আগে, যখন আর- রেটেড কমেডির রমরমা সময়, তখন ‘ব্রাইডসমেইডস’ বানিয়ে তিনি ঘরানার সীমা ভেঙে দিয়েছিলেন, একটি পুরোপুরি নারীকেন্দ্রিক ছবি দিয়ে। ইউনিভার্সালের সেই সিনেমা সে বছর সর্বোচ্চ আয় করা ছবির তালিকায় ছিল ১২ নম্বরে। এটি ২০২৪ সালের আলোচিত বই থেকে সিনেমায় রূপান্তর ‘ইট এন্ডস উইথ আস’-কেও ছাড়িয়ে গেছে, যেটির আয় ছিল ২৫০ মিলিয়ন ডলার।

এরপর ফিগ হয়ে ওঠেন হলিউডের ‘টোস্ট অব দ্য টাউন’। ‘ব্রাইডসমেইডস’-এর অভিনেত্রী মেলিসা ম্যাককার্থির সঙ্গে তাঁর গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠ পেশাগত সম্পর্ক। একের পর এক সফল ছবি আসে- ‘দ্য হিট ’(২০১৩), ‘স্পাই!’(২০১৫)। তবে প্রতিবারই লড়াই করতে হয়েছে। 

পল ফিগ বলেন, ‘আমি জানি না আমার ক্যারিয়ারে কতবার হলিউডকে প্রমাণ করতে হয়েছে যে নারীরা সিনেমা হলে আসে। “ব্রাইডসমেইডস”-এর সময় হয়েছিল, “স্পাই”-এর সময় হয়েছিল, “দ্য হিট”-এর সময় হয়েছিল। “আ সিম্পল ফেভার” কিছুটা কম চলেছিল, কারণ, আমি যতটা চেয়েছিলাম ততটা হয়নি। তবু সেটাকেও সফল ধরা হয়, কারণ, বাজেট ছিল খুবই কম। এটা আমার কাজ। আমি এটা বারবার করি। কিন্তু প্রতিবারই শহরটা অবাক হয়, নারীরা সিনেমা দেখতে আসে দেখে। অথচ এটা বিশাল এক দর্শকগোষ্ঠী, যাদের শুধু ভালো কনটেন্ট দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু তাদের ভালো জিনিসই দিতে হবে। বাজে কিছু দিলেই চলবে না। দীর্ঘদিন ধরে একধরনের রোমান্টিক কমেডি বা রম-কম বানানো হয়েছে- কিছু ভালো ছিল, কিছু ছিল না। তারপর মান কমতে শুরু করে, কারণ কেউ কেউ ভাবছিল, “নারীরা তো এমনিতেই দেখবেন।” কিন্তু না, নারীরাও অন্য সবার মতোই বিচার-বিবেচনাসম্পন্ন দর্শক। তাই তাদের জন্য দারুণ কিছু বানাতে হবে।

এরপর আসে ‘ঘোস্টবাস্টার্স’-এর সেই রিবুট, যেখানে পুরো দলটাই ছিল নারী অভিনেত্রীদের নিয়ে। ছবিটি বিশ্বজুড়ে ২২৯ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করলেও উচ্চ বাজেট ও বিপুল বিপণন খরচের কারণে সেটিকে ব্যর্থ হিসেবেই ধরা হয়। এরপর ফিগ আর কোনো বড় স্টুডিওর সঙ্গে কাজ করেননি। তবু নারীকেন্দ্রিক ছবি বানানো থেকে সরে যাননি। ‘আ সিম্পল ফেভার’ যায় লায়ন্সগেটের কাছে, আর এর সিকুয়েল ‘আ সিম্পল ফেভার ২’ মুক্তি পায় সরাসরি অ্যামাজন প্রাইমে, যার বড় কারণ ছিল মহামারি।

দ্য হাউজমেইড’

এবার আসে ‘দ্য হাউজমেইড’, যার গল্পভিত্তিক দুটি সিকুয়েল আগে থেকেই প্রস্তুত, কারণ বইটি একটি ট্রিলজি। অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, এখনো সিডনি সুইনির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি না হলেও তিনি ‘দ্য হাউজমেইডস সিক্রেট’-এ ফিরবেন বলেই ধরা হচ্ছে। দ্বিতীয় বইয়ে আমান্ডা সেফ্রিডের চরিত্র নেই, তবে তিনি ও নির্মাতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁর চরিত্রটি কোনোভাবে হাজির হতে পারে।

প্রথম ছবির সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন প্রযোজক কার্লি এলটার (হিডেন পিকচার্স)। তিনি বইটি প্রকাশের আগেই পাণ্ডুলিপি পড়ে মুগ্ধ হন। টড লিবারম্যানের সঙ্গে তিনি এটি নিয়ে যান লায়ন্সগেটের নির্বাহী চেলসি কুজাওয়ার কাছে। তিনিও গল্পে মুগ্ধ হন। এরপর লায়ন্সগেট প্রেসিডেন্ট এরিন ওয়েস্টারম্যান বই প্রকাশের আগেই স্বত্ব কিনে নেন এবং পুরো প্রকল্পটি দাঁড় করাতে বড় ভূমিকা রাখেন।

লায়ন্সগেট মোশন পিকচার গ্রুপের চেয়ারম্যান অ্যাডাম ফোগেলসন বলেন, ‘নারী দর্শক ছিল এবং থাকবে - এটা বিশাল এক সম্ভাবনা, যদি সঠিক বাজেটে সঠিক অংশীদারদের নিয়ে ছবি বানানো যায়। এতে সৃজনশীল ও আর্থিক- দুটো দিক থেকেই অভাবনীয় সাফল্য আসে।’

পল ফিগের নেতৃত্বে কাজ করে তাঁর প্রধান অভিনেত্রীরাও উচ্ছ্বসিত। আমান্ডা সাইফ্রেড বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ফিগের সঙ্গে কাজ করে তিনি নিজেকে ‘পুরোপুরি মুক্ত’ মনে করেছেন। ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, যা তাঁর অভিনয়কে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, ফিগকে অভিনয়ের মাধ্যমে চমকে দিতে তিনি উপভোগ করতেন।

পল ফিগ নিজে বলেন, ‘আমরা যেটা করেছি, যেটা সবার করা উচিত- এই ছবিটা দর্শকদের দলগত অভিজ্ঞতার জন্য বানানো। থিয়েটারে মানুষ একসঙ্গে এই ছবি দেখলে পাগল হয়ে যায়। শুরু থেকেই হাসি, হাঁপ ধরা মুহূর্ত, চমক- সবকিছু আছে। আমি টেস্ট স্ক্রিনিং শুরু করি ডিরেক্টরস কাটের পাঁচ সপ্তাহের মাথায়। শুধু অডিও নয়, নাইট-ভিশন ক্যামেরায় দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও দেখি, তারা সামনে ঝুঁকছে কি না, চোখ ঢাকছে কি না, লাফিয়ে উঠছে কি না।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই কারণেই ছবিটি এত ভালো চলছে। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে- এই সিনেমা হলে গিয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। দর্শক শুধু পপকর্ন খেয়ে ফোন দেখছে না, পুরোপুরি জড়িয়ে পড়ছে। এটাই নির্মাতাদের করতে হবে। না হলে সবই শেষ পর্যন্ত স্ট্রিমিংয়ে চলে যাবে। আমি বহুবার বলেছি, এটা আমার পঞ্চম ছবি, যা ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করল, আর সব কটিই নারীপ্রধান ছবি।’

ছবিতে সিডনি সুইনি অভিনয় করেছেন গৃহকর্মী মিলি ক্যালোওয়ে চরিত্রে। কারাভোগের পর জীবনে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে তিনি লং আইল্যান্ডের ধনী উইনচেস্টার পরিবারের বাড়িতে আবাসিক গৃহকর্মীর কাজ নেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বোঝা যায়, তাঁদের ঝাঁ-চকচকে প্রাসাদের আড়ালে লুকিয়ে আছে অস্বস্তিকর পারিবারিক গোপন রহস্য। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে মিলি ও তাঁর নিয়োগকর্তা নিনা উইনচেস্টারের (অভিনয়ে আমান্ডা সেফ্রিড) টানাপোড়েনের সম্পর্ক। দুই নারীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য যেভাবে বদলাতে থাকে, তাতে ভুক্তভোগী ও নিয়ন্ত্রণকারী- এই দুইয়ের সীমারেখা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। সূত্র: দ্য হলিউড রিপোর্টার