দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তার প্রধান ভরসা হিসেবে পরিচিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচটি ডপলার রাডার বর্তমানে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা মারাত্মক সংকটে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
শনিবার (৫ জুলাই) তারিখের তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, ঢাকা, কক্সবাজার, পটুয়াখালীর খেপুপাড়া, রংপুর ও মৌলভীবাজারে স্থাপিত রাডারগুলোর মধ্যে তিনটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অচল। কারিগরি ত্রুটি, যন্ত্রাংশের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই তিনটি রাডার ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বাকি দুটি রাডারের অবস্থাও স্থিতিশীল নয়; এর মধ্যে রংপুরের রাডারটি ১৭ জুন থেকে এবং ঢাকার রাডারটি ৪ জুলাই থেকে বন্ধ রয়েছে।
ফলে বর্তমানে কার্যত দেশের কোনো রাডার থেকেই পূর্ণাঙ্গ আবহাওয়াগত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে আবহাওয়া অধিদপ্তর বাধ্য হয়ে অন্যান্য সংস্থা, বিশেষ করে বিমানবাহিনীর রাডার ও উপগ্রহচিত্রের ওপর নির্ভর করে পূর্বাভাস তৈরি করছে। এতে তথ্যের নির্ভুলতা ও সময়োপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডপলার রাডার অচল থাকলে সমুদ্র থেকে আসা ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপের গতিপথ নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সাধারণত একটি রাডার ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরের আবহাওয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে, যা উপকূলীয় এলাকায় অন্তত ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা আগাম সতর্কতা দিতে সক্ষম। এই ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠী বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, স্যাটেলাইট চিত্র থেকে মেঘের বিস্তার বোঝা গেলেও বৃষ্টিপাতের তীব্রতা ও স্থানীয় প্রভাব সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায় না। ফলে রাডার নির্ভর পর্যবেক্ষণই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাডারগুলোর কারিগরি সমস্যার সমাধানে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। ঢাকার রাডারটি বিদ্যুৎ সংযোগজনিত সমস্যার কারণে বন্ধ থাকলেও দ্রুত তা চালুর চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে রংপুরের রাডারের ক্ষেত্রে জাপানি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ দল আসার অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে আবহাওয়ার চলমান পরিস্থিতিতে আরও জানা গেছে, দেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে চলতি মৌসুমের দ্বিতীয় শক্তিশালী বৃষ্টিবলয়, যার নাম ‘ধারা’। ৫ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এটি পর্যায়ক্রমে সক্রিয় থাকবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। বিশেষ করে ৭ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত সময়ে সারাদেশে এর সর্বোচ্চ প্রভাব পড়তে পারে।
এই বৃষ্টিবলয়ের কারণে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বৃষ্টির তীব্রতা বেশি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত হতে পারে।
অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের কিছু এলাকায় আকস্মিক বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে। নিম্নাঞ্চলগুলো সাময়িক জলাবদ্ধতার মধ্যে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, গুরুত্বপূর্ণ রাডারগুলো অচল থাকায় এবং ভারী বর্ষণঘন বৃষ্টিবলয়ের প্রভাবে দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি নজরদারি ও পূর্বাভাস ব্যবস্থায় এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা উপকূল ও পাহাড়ি অঞ্চলের জনজীবনের জন্য বাড়তি ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।