এভারেস্ট থেকে তরাই: নেপালের ভূপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের বিস্ময়

দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে আয়তনে তুলনামূলক ছোট হলেও ভূপ্রাকৃতিক ও জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ দেশ নেপাল। উত্তরের তুষারাবৃত হিমালয় থেকে দক্ষিণের সমতল ও উর্বর তরাই, মাত্র কয়েকশ কিলোমিটারের মধ্যে উচ্চতার ব্যাপক তারতম্য দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চলে পরিণত করেছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলন, ভূমিধস, বন্যা ও ভূমিকম্পের মতো ঝুঁকিও ক্রমেই বাড়ছে।

প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫১৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের স্থলবেষ্টিত নেপালের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কেচনাকওয়ালের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৭০ মিটার। বিপরীতে দেশটির উত্তর সীমান্তে অবস্থিত মাউন্ট এভারেস্ট বা সাগরমাথার উচ্চতা ৮ হাজার ৮৪৮ দশমিক ৮৬ মিটার। উত্তর-দক্ষিণে এই বিপুল উচ্চতার পার্থক্যের কারণে দেশটিতে একই সঙ্গে গ্রীষ্মমণ্ডলীয়, উপক্রান্তীয়, সমশীতোষ্ণ, আলপাইন এবং মেরুপ্রধান জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

তিন প্রধান ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল

নেপালের ভূপ্রকৃতিকে সাধারণভাবে তিনটি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করা হয়—হিমাল, পাহাড় ও তরাই। উত্তরের হিমাল অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার মিটারের ওপরে বিস্তৃত। বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বতশৃঙ্গের মধ্যে আটটি নেপাল বা দেশটির সীমান্তে অবস্থিত। এভারেস্ট ছাড়াও কাঞ্চনজঙ্ঘা, লহৎসে, মকালু, চো ওইয়ু, ধবলগিরি, মানাসলু ও অন্নপূর্ণা এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পর্বতশৃঙ্গ।

তীব্র শীত, তুষারাবৃত ভূখণ্ড ও হিমবাহের কারণে হিমাল অঞ্চলে জনবসতি তুলনামূলকভাবে কম। শেরপা ও তামাংসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা গবাদিপশু পালন, স্থানীয় বাণিজ্য এবং পর্বতারোহণ ও পর্যটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

হিমালয়ের দক্ষিণে রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল। উর্বর উপত্যকা, তুলনামূলক নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া ও কৃষির উপযোগী পরিবেশের কারণে এই অঞ্চল নেপালের জনবসতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। রাজধানী কাঠমান্ডু ও পর্যটননগরী পোখরা এ অঞ্চলে অবস্থিত। পাহাড়ের ঢালে ধাপচাষ এবং ওক, পাইন, ফার ও রডোডেনড্রনসমৃদ্ধ বনভূমি এ অঞ্চলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

দেশটির দক্ষিণ প্রান্তে ভারত সীমান্তঘেঁষা তরাই অঞ্চল মূলত সমতল ও উর্বর। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর বহন করা পলি জমে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল নেপালের প্রধান কৃষি উৎপাদন কেন্দ্র। ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক চাষ হয় এখানে। বিরাটনগর, জনকপুর ও বীরগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক শহরও তরাই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে।

নদী ও জলবায়ুর বৈচিত্র্য

নেপালের ভূপ্রকৃতির সঙ্গে দেশটির নদী ব্যবস্থার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। হিমালয়ের তুষারক্ষেত্র ও হিমবাহ থেকে উৎপন্ন নদীগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত গঙ্গা অববাহিকায় যুক্ত হয়েছে। কোশী, গণ্ডকী বা নারায়ণী এবং কর্নালী—দেশটির তিনটি প্রধান নদী অববাহিকা।

এই নদীগুলো পাহাড়ি ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় গভীর খাদ ও গিরিখাত সৃষ্টি করেছে। ধবলগিরি ও অন্নপূর্ণা পর্বতশ্রেণির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কালি গণ্ডকী গিরিখাত বিশ্বের অন্যতম গভীর গিরিখাত হিসেবে পরিচিত। নদীগুলো তরাইয়ের কৃষিজমিতে পলি সরবরাহের পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।

ছোট দেশ, বড় জীববৈচিত্র্য

ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর এই বৈচিত্র্যের প্রভাব পড়েছে নেপালের জীববৈচিত্র্যেও। বিশ্বের মোট ভূখণ্ডের খুব সামান্য অংশজুড়ে অবস্থান করেও দেশটি বিপুলসংখ্যক উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির আবাসস্থল।

তরাইয়ের বনভূমিতে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, একশৃঙ্গ গণ্ডার, এশীয় হাতি, বুনো মহিষ, সোয়াম্প ডিয়ার ও ঘড়িয়াল। চিতওয়ান, বার্দিয়া ও শুক্লাফাঁটা জাতীয় উদ্যান এসব প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।

অন্যদিকে মধ্য ও উচ্চ হিমালয়ে পাওয়া যায় হিমচিতা ও রেড পান্ডার মতো বিরল প্রাণী। সাম্প্রতিক জরিপ ও ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে নেপালে প্রায় ৩৯৭টি হিমচিতার অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটিতে প্রায় ৮৬৭ থেকে ৮৯২ প্রজাতির পাখিও রয়েছে। এর মধ্যে স্পাইনি ব্যাবলার নেপালের একমাত্র স্থানীয় পাখি প্রজাতি হিসেবে পরিচিত।

উদ্ভিদজগতেও নেপাল সমৃদ্ধ। দেশটিতে ৬ হাজার ৫০০ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৯৭৩ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ রয়েছে। তরাইয়ে সালবন, মধ্য পাহাড়ে ওক, পাইন ও ফার এবং উচ্চভূমিতে বিভিন্ন ঔষধি ও বিরল উদ্ভিদ দেখা যায়। রডোডেনড্রন নেপালের জাতীয় ফুল।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের বড় ঝুঁকি

প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের পাশাপাশি নেপাল বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ পাহাড়ি দেশ। ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে দেশটি ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প এর বড় উদাহরণ।

বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢাল, ভূমিক্ষয় ও ভূমিধসও বড় সমস্যা। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত নবীন ও ভঙ্গুর চুরে বা শিবালিক পর্বতমালায় অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহার ও বন উজাড়ের কারণে মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। নদীতে অতিরিক্ত পলি জমে নিচু এলাকায় বন্যা এবং কৃষিজমিতে বালু জমার ঘটনাও ঘটছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সংকট। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা বা গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাডের (GLOF) আশঙ্কা বাড়ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে পানির প্রাপ্যতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

সংরক্ষণে সাফল্য, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

প্রাকৃতিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও পরিবেশ সংরক্ষণে নেপাল বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক কমিউনিটি ফরেস্ট্রি কার্যক্রম দেশটির বন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং চোরাশিকারবিরোধী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাঘ, গণ্ডার ও হিমচিতাসহ বিভিন্ন বিপন্ন প্রাণীর সংরক্ষণে অগ্রগতি হয়েছে।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তে থাকা চাপ নেপালের পরিবেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের পরিবেশগত ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে টেকসই পাহাড়ি অবকাঠামো নির্মাণ, হিমবাহ ও হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পরিবেশ সংরক্ষণে আরও সম্পৃক্ত করার ওপর। হিমালয় থেকে তরাই পর্যন্ত বিস্তৃত এই অনন্য প্রাকৃতিক ব্যবস্থা শুধু নেপালের সম্পদ নয়—সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার পানি, জলবায়ু ও পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।