আফ্রিকার দেশ নামিবিয়া বিশ্বজুড়ে ‘সবুজ হাইড্রোজেন’ (Green Hydrogen) বা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সরবরাহের এক মহিরুহ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। সরকারের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশটিতে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে বলছেন, এই বিশাল শিল্প প্রকল্পের কারণে বিলুপ্তির চরম ঝুঁকিতে পড়বে বিপন্ন ‘আফ্রিকান পেঙ্গুইন’ এবং ওই অঞ্চলের দুর্লভ মরু উদ্ভিদ।
জার্মানি-ভিত্তিক গ্রিন এনার্জি গ্রুপ ‘এনারট্র্যাগ’-এর নেতৃত্বে ‘হাইফেন’ নামক একটি যৌথ উদ্যোগ নামিবিয়ার উপকূলীয় মরুভূমি অঞ্চলে এই প্রকল্পটি শুরু করতে যাচ্ছে। এতে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা নামিবিয়ার বার্ষিক জিডিপি-র (১৩ বিলিয়ন ডলার) প্রায় কাছাকাছি। কোম্পানিটি বলছে, নামিবিয়ার বাতাস ও রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের জন্য ‘বিশ্বমানের’।

এই প্রকল্পটি গড়ে তোলা হবে ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের ‘সাউ খায়েব ন্যাশনাল পার্ক’-এ। হীরা খনির কারণে এলাকাটি গত ১০০ বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল, ফলে সেখানে এক অনন্য জীববৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে। নামিবিয়ার চেম্বার অফ এনভায়রনমেন্ট (NCE) তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, এই প্রকল্প সফল করতে গিয়ে অনেক দুর্লভ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তারা একে ‘সবুজ হাইড্রোজেন’ না বলে ‘রেড হাইড্রোজেন’ হিসেবে চিহ্নিত করার পরামর্শ দিয়েছে।
সংস্থাটির প্রধান ক্রিস ব্রাউন জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলোর কড়া সমালোচনা করে বলেন, ‘জার্মানরা কখনোই তাদের দেশের শ্রেষ্ঠ পার্কগুলোকে শিল্পাঞ্চলে রূপান্তর করতে দেবে না। কিন্তু তারা নামিবিয়ার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে নিজেদের জ্বালানি নিশ্চিত করতে দ্বিধাবোধ করছে না।’

প্রকল্পের জন্য লুইডারিটজ (Lüderitz) বন্দর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই এলাকাটি বিপন্ন আফ্রিকান পেঙ্গুইনের প্রধান বিচরণস্থল। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০৩৫ সালের মধ্যেই বন্য পরিবেশে এই পেঙ্গুইন প্রজাতিটি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। সামুদ্রিক পাখি সংরক্ষণ সংস্থা ‘নামকব’ (Namcob) জানিয়েছে, বন্দর সম্প্রসারণ সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের অপূরণীয় ক্ষতি করবে।
নামিবিয়ায় যুব বেকারত্বের হার ৪৪ শতাংশ। সাবেক মেয়র ফিল বালহাও মনে করেন, এই বিনিয়োগ লুইডারিটজ শহরের চেহারাই বদলে দেবে। হাইফেন কোম্পানির দাবি, নির্মাণ পর্যায়ে ১৫ হাজার এবং কার্যক্রম শুরু হলে ৩ হাজার মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান হবে। তবে তরুণ কর্মীদের দাবি, কাজগুলোর জন্য যে কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন, তা নামিবিয়ার সাধারণ মানুষের কতটা আছে সে বিষয়ে স্বচ্ছতা নেই।

এই প্রকল্পের আরেকটি স্পর্শকাতর দিক হলো ‘শার্ক আইল্যান্ড’। ১৯০৪-১৯০৮ সালে জার্মানির ঔপনিবেশিক বাহিনী এই দ্বীপে হাজার হাজার আদিবাসী মানুষকে হত্যা করেছিল। এই গণহত্যা ও যন্ত্রণার স্মৃতিবিজড়িত এলাকার খুব কাছে শিল্প স্থাপন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অধিকারকর্মীরা।
২০২৬ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত আসার কথা রয়েছে। উন্নয়ন আর পরিবেশের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার জয় হবে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে তুমুল বিতর্ক।
বিলুপ্তির কয়েক দশক পর দেখা মিললো ‘লার্জ টর্টোইসশেল’ প্রজাপতির
আগামী ৫ দিন যেমন থাকবে আবহাওয়া
