বাংলাদেশে আবারও ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি। চলতি বছরের একই সময়ের তুলনায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। একই সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে প্রায় ৭৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বরজুড়ে ব্যাপক সংক্রমণের পর অক্টোবরেও পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষণ নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) তথ্য অনুযায়ী, ৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৪ হাজার ৩৬৯ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ২৫৬ জন। গত বছরের একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৪৮ হাজার ৪৯১ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ২০২ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রোগী বেড়েছে ৩৫ হাজার ৮৭৮ জন বা প্রায় ৭৪ শতাংশ। মৃত্যুও বেড়েছে ৫৪ জন, যা প্রায় ২৭ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরে ১৪৮ মৃত্যু
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সেপ্টেম্বরে সংক্রমণের ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ মাসে মারা গেছেন ১৪৮ জন।
অর্থাৎ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর অর্ধেকেরও বেশি এবং মোট মৃত্যুর প্রায় ৫৮ শতাংশই হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসে। আগস্টে যেখানে ডেঙ্গুতে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৮ জনে।
জুনে ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। জুলাইয়ে মারা যান ৩৬ জন। আগস্টে মৃত্যু বেড়ে হয় ৪৩ জন। এরপর সেপ্টেম্বরে এক লাফে মৃত্যু দাঁড়ায় ১৪৮ জনে।
অক্টোবরেও কমেনি সংক্রমণ
অক্টোবরের প্রথম তিন দিনেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। এই তিন দিনে নতুন করে ৪ হাজার ৭৪৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ১১ জন।
৩ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৬০৮ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ হাজার ৬৩১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৭৮ হাজার ৪৮২ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
কোথায় বেশি রোগী?
৩ অক্টোবরের ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তির হিসাবে চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১৯ জন, খুলনা বিভাগে ২৭৬ জন এবং বরিশাল বিভাগে ২১৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭১ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২২৩ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ঢাকা বিভাগের অন্যান্য এলাকায় ভর্তি হয়েছেন আরও ১৩১ জন।
রাজশাহী বিভাগে ১৩২ জন, ময়মনসিংহে ৭৯ জন এবং রংপুরে ৬২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মারা যাওয়া ছয়জনের মধ্যে দুজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এবং দুজন রাজশাহী বিভাগের বাসিন্দা। বাকি দুজনের একজন খুলনা ও একজন বরিশাল বিভাগের।
কেন বাড়ছে মৃত্যু?
জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে দেরিতে হাসপাতালে যাওয়া, দ্রুত রোগ নির্ণয়ের ঘাটতি এবং গুরুতর রোগীর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা অন্যতম।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ডেঙ্গুর গুরুতর পর্যায়ে রোগীর শরীরে রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে, রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং বুক বা পেটে তরল জমতে পারে। এসব অবস্থায় দেরিতে চিকিৎসা শুরু হলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এইচ এম নাজমুল আহসান সম্প্রতি বলেছেন, ডেঙ্গুর গুরুতর অবস্থা অনেক সময় জ্বরের তৃতীয় বা চতুর্থ দিনে তৈরি হয়। তাই জ্বর শুরু হওয়ার পর এবং তৃতীয়-চতুর্থ দিনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্লাটিলেট কমে গেলেই প্লাটিলেট দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। অপ্রয়োজনীয় প্লাটিলেট দেওয়া কিংবা অতিরিক্ত তরল শরীরে প্রবেশ করানোও গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু ফগিং যথেষ্ট নয়
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক এডিস মশা নিধনে ফগিংয়ের ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া কঠিন বলে জানিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার।
তাঁর মতে, মশার ডিম ও লার্ভা ধ্বংস না করলে নতুন প্রজন্মের এডিস মশা তৈরি হতে থাকবে। নির্মাণাধীন ভবন, জমে থাকা পানি এবং বিভিন্ন পরিত্যক্ত পাত্র এডিস মশার প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুধু ডেঙ্গু বাড়ার সময় জোরদার করলে হবে না; সারা বছরই প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং নিয়মিত নজরদারি চালাতে হবে।
২০২৩ এর ভয়াবহতার নিচে, কিন্তু উদ্বেগ বাড়ছে
চলতি বছরের পরিস্থিতি এখনো ২০২৩ সালের ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতির কাছাকাছি পৌঁছায়নি। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মারা গিয়েছিলেন ১ হাজার ৭০৫ জন যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
তবে চলতি বছরের সংক্রমণের গতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের বিপুলসংখ্যক রোগী ও মৃত্যুর পর অক্টোবরেও প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পরিস্থিতির তীব্রতা তুলে ধরছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও অন্যান্য পরিবেশগত পরিস্থিতির ওপর ডেঙ্গুর বিস্তার অনেকটাই নির্ভরশীল। ফলে পরিস্থিতি কখন নিয়ন্ত্রণে আসবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।
সামনে আরও সতর্কতার প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় একসঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে প্রজননস্থল ধ্বংস, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং গুরুতর রোগীদের জন্য কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
চলতি বছর মৃত্যুহার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেড়ে যাওয়ার তথ্যটি তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আগাম প্রস্তুতি, মশা নিধন এবং হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।