মানব মস্তিষ্কের টিস্যু নিয়ে গবেষণায় মিললো বড় সাফল্য

আলঝেইমার্স (মস্তিস্কের এক ধরনের রোগ যার ফলে কিছু মনে রাখতে না পারে না রোগী) এবং মস্তিষ্কের আঘাতের মতো জটিল রোগগুলোতে দেখা দেওয়া প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন রোধের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি মানব মস্তিষ্কের কোষে পরিচালিত এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যমান একটি বিশেষ ওষুধের মাধ্যমেই মস্তিষ্কের ভেতরের এই প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নিকোলাস বার্নসের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাটি সম্প্রতি ‘ব্রেইন’ নামক আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় একটি নির্দিষ্ট রিসেপ্টর বা গ্রাহক চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ব্লক বা বাধাগ্রস্ত করার মাধ্যমে মস্তিষ্কের নিউরোইনফ্লেমেশন বা স্নায়বিক প্রদাহ থামানো সম্ভব।

মানব মস্তিষ্কের টিস্যু নিয়ে করা এই প্রথম ধরনের গবেষণায় দেখা গেছে, এই পথটি অবরুদ্ধ করার মাধ্যমে ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি (টিবিআই), অ্যালঝেইমার্স, পারকিনসন্স-এর মতো অবক্ষয়জনিত রোগ এবং এমনকি বিষণ্ণতা বা সাইকোসিসের মতো মানসিক ব্যাধিগুলোও সফলভাবে নিরাময় করা সম্ভব। কারণ বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই মানসিক রোগগুলোর পেছনেও স্নায়বিক প্রদাহের বড় ভূমিকা রয়েছে।

নিউরোসার্জারির সময় সংগৃহীত জীবন্ত মানব মস্তিষ্কের কোষ এবং টিস্যুর স্লাইস ব্যবহার করে গবেষক দল ‘পি২এক্স৭ (P2X7) রিসেপ্টর’ নামক একটি গ্রাহকের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করেন। এই রিসেপ্টরটি মূলত মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টিকারী সংকেতগুলো সক্রিয় করে তোলে।

তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এই পি২এক্স৭ রিসেপ্টরগুলো প্রদাহ নিয়ন্ত্রণকারী ‘সাইটোকাইন’ নামক গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনগুলোর নিঃসরণ ঘটায়। একটি নির্দিষ্ট ওষুধ বা এন্টাগোনিস্টের সাহায্যে এই রিসেপ্টরকে বাধাগ্রস্ত করার মাধ্যমে মানব মস্তিষ্কের টিস্যুতে প্রদাহের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন গবেষকরা।

বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির কলেজ অব মেডিসিন অ্যান্ড হেলথের অধ্যাপক বার্নস বলেন, "এই রোমাঞ্চকর আবিষ্কারটি স্নায়বিক প্রদাহের মূল উৎসকে প্রতিহত করতে প্রচলিত ওষুধগুলোর নতুন ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ। আলঝেইমার্স, পারকিনসন্স, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস বা সিজোফ্রেনিয়া ও ডিপ্রেশনের মতো জটিল মস্তিষ্কের ব্যাধি চিকিৎসায় এই রিসেপ্টরের ভূমিকা দূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।"

মস্তিষ্কের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধক কোষ নিয়ে গবেষণা

মস্তিষ্কের কোষগুলো কীভাবে প্রদাহের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং তা মোকাবিলা করে, তা জানতে গবেষকরা রক্তের এক বিশেষ ধরনের শ্বেতকণিকা থেকে মাইক্রোগ্লিয়া (microglia) তৈরির একটি অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এই মাইক্রোগ্লিয়া হলো মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক।

রক্তের নমুনা থেকে সংগৃহীত মানব মনোসাইটকে মাইক্রোগ্লিয়া সদৃশ কোষে রূপান্তর করে গবেষকরা দেখেন যে, এগুলো প্রদাহের সংকেতে কীভাবে সাড়া দেয়। পরবর্তীতে পি২এক্স৭ রিসেপ্টর এন্টাগোনিস্ট ব্যবহার করে তারা এই মাইক্রোগ্লিয়াগুলোর সৃষ্ট প্রদাহের ট্রিগারগুলো বন্ধ করতে সক্ষম হন।

অধ্যাপক বার্নস জানান, মানব মস্তিষ্কের মাইক্রোগ্লিয়া নিয়ে গবেষণা করা দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ মস্তিষ্ক থেকে বের করে আনার পর এগুলো খুব দ্রুত তাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে। তবে তাদের উদ্ভাবিত এই নতুন পদ্ধতির ফলে মানব কোষের জীববিজ্ঞান নিয়ে নিখুঁত ও বড় পরিসরে গবেষণা করা সম্ভব হয়েছে।

এই গবেষণার সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে এখন নিউরোডিজেনারেটিভ বা স্নায়বিক অবক্ষয়জনিত রোগ এবং টিবিআই (মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত) রোগীদের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানবদেহে পরীক্ষার পরবর্তী ধাপ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন গবেষকরা। কারণ বর্তমানে এই ধরনের স্নায়বিক প্রদাহ ও তার ফলে হওয়া ক্ষতি কুণ্ঠিত করার মতো কোনো কার্যকর ওষুধ চিকিৎসকদের হাতে নেই।