বিশ্ব বাবা দিবস

বাবা শব্দের কোনো প্রতিশব্দ হয় না

পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জিনিসটা কী? এমন প্রশ্নে কোনো বিজ্ঞানী হয়তো জটিল উত্তর দেবেন। কিন্তু যে সন্তান তার বাবার কাঁধের ওপর ভর করে বড় হয়েছে, সে জানে- পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জিনিস বৃদ্ধ বাবার সেই শীর্ণ হাতখানা, যা একসময় তাকে আগলে রাখত, আর আজ অবশ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে। 

আজ জুন মাসের তৃতীয় রোববার (২১ জুন) বিশ্ব বাবা দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় একটা দিন নির্দিষ্ট করে বাবাকে হয়তো মাপা যায় না, কিন্তু এই একটা দিন আমাদের বুকের ভেতর জমে থাকা শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর অপরাধবোধ সমস্ত জড়তার বাঁধগুলোকে ভেঙে দেয়। বাবার প্রতি আপন অনুভূতি প্রকাশে খুলে দেয় হৃদয়ের দরজা।

বাবা শব্দটার কোনো প্রতিশব্দ হয় না। মা যদি হন ঘরের ভেতরের শীতল হাওয়া, বাবা তবে বাইরের ঝড়-তুফান আটকে রাখা শক্ত দেয়াল। ছোটবেলায় দেখতাম, তীব্র রোদ কিংবা কাদা-জল মাড়িয়ে বাবা যখন রাতে ঘরে ফিরতেন, তার শার্টের কলারটা ঘামে লেপ্টে থাকত। আমরা ভাই-বোনেরা দৌঁড়ে গিয়ে বলতাম, ‘বাবা, কী এনেছ?’ খুব কিছু না হলেও বাবা ক্লান্ত মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে পকেট থেকে একটা সস্তা চকলেট বা বিস্কুটের প্যাকেট বের করতেন। আমরা সেটা কেড়ে নিয়ে খুশিতে নাচতাম। কেউ কখনো বাবার সেই ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করিনি- ‘বাবা, তুমি আজ দুপুরে কিছু খেয়েছ? তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?’ বাবাদের হয়তো এই এক নিয়ম, নিজেদের সবটুকু কষ্ট পকেটের গভীরে লুকিয়ে সন্তানদের জন্য বয়ে আনে আনন্দ।

১৯১০ সালে সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক নারীর উদ্যোগে প্রথম জুন মাসে বিশেষভাবে বাবা দিবস উদ্‌যাপন করা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মায়েদের পাশাপাশি বাবারাও সন্তানের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই বার্তা ছড়িয়ে দিতেই এই দিবসের সূচনা। পরে ১৯৬৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন একে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন। 

আজ বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবাদের ভালোবাসা প্রকাশের ধরণটা একটু ভিন্ন। এখানে কোনো ‘আই লাভ ইউ, বাবা’ বলা হয় না, কোনো জড়িয়ে ধরা হয় না। এখানে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে গভীর রাতে সন্তানের গায়ের ওপর আলতো করে কাঁথাটা টেনে দেওয়ার মাঝে, কিংবা নিজে ছেঁড়া জুতো পরে সন্তানের জন্য নামী ব্র্যান্ডের নতুন জুতো কিনে আনার ত্যাগে।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমরা যখন নিজেদের জগৎ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, বাবা তখন একলা হতে শুরু করেন। একসময় যে মানুষটার পায়ের শব্দ শুনলে পুরো বাড়ি থমকে যেত, বৃদ্ধ বয়সে সেই মানুষটার অনবদ্য কাশির শব্দও যেন ঘরের বাতাসে মিলিয়ে যায়। ঝাপসা চোখে চশমাটা নাকের ডগায় ঝুলিয়ে বাবা বারান্দায় বসে থাকেন, শুধু এই আশায়- অফিস থেকে ফিরে সন্তান অন্তত পাঁচটা মিনিট তার পাশে বসবে। কিন্তু আমাদের সময় হয় না। আমরা পাশ কাটিয়ে চলে যাই। বাবা এক বুক দীর্ঘশ্বাস চেপে আকাশের পর্দায় চোখ রাখেন।

সবচেয়ে বেশি বুকটা ভেঙে যায় তখন, যখন কোনো এক বিকেলে হঠাৎ খেয়াল হয়- বাবার মাথার সবকটি চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে, সোজা হয়ে হাঁটা মানুষটা আজ সামান্য কুঁজো হয়ে হাটছেন। যে হাতটা ধরে একদিন মেলায় গিয়েছিলাম, সেই হাতটা আজ কাঁপছে। তখন মনে হয়, ইস! যদি সময়টাকে একটুখানি থামিয়ে দেওয়া যেত! যদি অতীতে ফিরে গিয়ে বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলা যেত, ‘বাবা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তুমি না থাকলে আমি কিচ্ছু পারতাম না।’

বাবা মানে একটা বটবৃক্ষ, যার ছায়াটা রোদ চলে যাওয়ার পর আরও বেশি করে মনে পড়ে। যাদের বাবা আজ বেঁচে আছেন, সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে আজই তার হাতটা জড়িয়ে ধরুন। আর যাদের বাবা আকাশের তারা হয়ে গেছেন, তারা কেবল শূন্যে তাকিয়ে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলুন। কারণ, বাবা হারানোর চেয়ে বড় কোনো একাকীত্ব এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি রইল আমার অতল শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালোবাসা।