ক্ষুধা পেলে কিছু মানুষ মেজাজ হারান কেন?

ক্ষুধা শুধু শরীরের জৈবিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়, এটি আমাদের মানসিক অবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। ইংরেজিতে একে এখন বলা হয় ‘হ্যাংরি’, অর্থাৎ ক্ষুধার কারণে খিটখিটে বা বিরক্ত হয়ে পড়া। শব্দটি তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও অনুভূতিটি খুব পুরোনো। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো কিছু মানুষ রেগে যান কেন? কিছু মানুষ রেগে যান কেন? এর পেছনে কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। এ বিষয়টি বোঝার জন্য গবেষকরা সম্প্রতি একটি গবেষণা করেন। এতে ৯০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ককে এক মাস ধরে বিশেষ একটি যন্ত্র পরতে দেওয়া হয়, যা শরীরের গ্লুকোজ বা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পরিমাপ করে। একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের দিনে এক থেকে দুইবার স্মার্টফোনে জানাতে বলা হয় তারা কতটা ক্ষুধার্ত বোধ করছেন এবং সেই মুহূর্তে তাদের মেজাজ কেমন।

১. গ্লুকোজের অভাব
গ্লুকোজ আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের প্রধান শক্তির উৎস। সাধারণত মনে করা হয়, রক্তে শর্করার মাত্রা কমলেই মানুষের মেজাজ খারাপ হয়। কিন্তু গবেষণার ফলাফল এখানেই চমক দিয়েছে।

গবেষকেরা দেখেছেন, শুধু গ্লুকোজ কমে গেলেই মানুষের মন খারাপ হচ্ছে না। বরং মানুষ যখন নিজে অনুভব করছে যে সে ক্ষুধার্ত, তখনই মেজাজ বেশি খারাপ হচ্ছে। অর্থাৎ শরীরের শক্তির অবস্থার সঙ্গে মনের অবস্থার মাঝখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ধাপ রয়েছে।

২. হরমোনের ভূমিকা
ক্ষুধা এবং মেজাজের ওপর হরমোনের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ক্ষুধার্ত হলে শরীরে ঘ্রেলিন নামক একটি হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায় যে, শরীরকে খাদ্য প্রয়োজন। পাশাপাশি, ক্ষুধা লাগলে কর্টিসল এবং অ্যাড্রেনালিন হরমোনের মাত্রাও বেড়ে যায়, যা আমাদের “ফাইট-অর-ফ্লাইট” প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই হরমোনগুলোর বৃদ্ধি মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয় এবং মানুষকে আরও বিরক্ত বা উত্তেজিত করে তোলে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ইন্টারোসেপশন বা নিজের শরীর বোঝার ক্ষমতা বেশি, তাদের মেজাজের ওঠানামা তুলনামূলকভাবে কম। তারা ক্ষুধা অনুভব করলেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। এতে তারা হঠাৎ রেগে যাওয়া বা খারাপ সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পান।

৩. সেরোটোনিনের ঘাটতি
সেরোটোনিন হলো আমাদের মস্তিষ্কের একটি রাসায়নিক, যা আমাদের মেজাজ এবং মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলে। যখন আমরা ক্ষুধার্ত থাকি, তখন সেরোটোনিনের মাত্রা কমে যায়, যা মেজাজকে আরও খারাপ করে। সেরোটোনিনের ঘাটতি উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং ঝগড়াটে স্বভাব সৃষ্টি করতে পারে।

৪. মস্তিষ্কের জ্বালানির ঘাটতি
ক্ষুধার কারণে রক্তে গ্লুকোজ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহও কমে যায়। মস্তিষ্কের প্রায় ২০% শক্তি গ্লুকোজ থেকে আসে, যা ক্ষুধার্ত অবস্থায় কমে গেলে মস্তিষ্ক তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি পায় না। এর ফলে মস্তিষ্কে স্নায়বিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, যার কারণে মেজাজ খারাপ হতে পারে।

৫. বিষণ্নতা এবং ক্লান্তি
ক্ষুধা শুধু মেজাজ খারাপ করে না, বরং এটি বিষণ্নতা এবং ক্লান্তিরও কারণ হতে পারে। ক্ষুধার্ত অবস্থায় শরীর এবং মস্তিষ্ক শক্তি হারাতে থাকে, যার ফলে আমরা অবসন্ন ও ক্লান্ত বোধ করি। এতে মেজাজ আরও খিটখিটে হয়ে যায় এবং আমরা সামান্য বিষয়েও বিরক্ত হয়ে উঠি।

৬. খাবারের অভ্যাসের প্রভাব
অনেক সময় আমাদের খাদ্যাভ্যাসের কারণে ক্ষুধার্ত হলে মেজাজ খারাপ হয়। যদি আমরা অনিয়মিত সময়ে খাই বা পুষ্টিকর খাবার না খাই, তবে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং শক্তি ঘাটতি দেখা দেয়, যা মেজাজ খারাপ করার অন্যতম কারণ হতে পারে। বিশেষত যারা হঠাৎ করে বেশি ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠেন, তাদের মধ্যে এই ধরনের আচরণ লক্ষ্য করা যায়।

৭. ক্ষুধার সংবেদন এবং মানসিক প্রতিক্রিয়া
ক্ষুধা শুধুমাত্র শারীরিক অনুভূতি নয়, এটি একটি মানসিক অবস্থাও। যখন আমরা ক্ষুধার্ত থাকি, আমাদের মন ও শরীর উভয়ই চাহিদা পূরণের জন্য খাদ্য খোঁজে। খাবার না পাওয়া গেলে মস্তিষ্ক এই সংকেতকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করে, যা আমাদের আচরণে বিরূপ প্রভাব ফেলে। অনেক সময় এই প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সূত্র : NDTV