জুনের তৃতীয় রোববার মানেই বিশ্ব বাবা দিবস। দিনটি এলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাবার সঙ্গে ছবি আর আবেগী ক্যাপশনের জোয়ার ভাসে। এই চেনা ট্রেন্ড তো আমরা প্রতিবছরই দেখি। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এই একটা দিনকে শুধু ‘হ্যাপি ফাদারস ডে’ লিখে ভার্চুয়াল স্টোরিতে বন্দি না রেখে, কীভাবে জীবনের সবচেয়ে অর্থপূর্ণ দিন করে তোলা যায়?
বাস্তবতা হলো, বাবাকে সেলিব্রেট করতে কোনো বড় বাজেট বা দামি উপহারের প্রয়োজন হয় না। যিনি প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে আমাদের খোঁজ নেন কিংবা মধ্যরাতে কপালে হাত দিয়ে জ্বর মাপেন, তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হলো একটুখানি সময় আর মনোযোগ। আমরা অনেকেই মুখে বাবাকে ‘ভালোবাসি’ বলতে পারি না। মুখ ফুটে বলতে না পারলে একটা ছোট্ট চিঠি লিখে তাঁর টেবিল বা পকেটে রেখে দেওয়া যায়, অথবা একটা টেক্সট মেসেজও পাঠানো যায়।
এই দিনে বাবাকে বলা যেতে পারে, ‘আজ অন্য সব কাজ বাদ, তোমার সাথে বসে গল্প করব।’ হতে পারে তা ক্রিকেট নিয়ে কিংবা তাঁর কোনো পুরোনো স্মৃতি নিয়ে। এখানে একটা চমৎকার পরীক্ষা করা যেতে পারে। বাবাকে জিজ্ঞেস করুন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন কোনটা ছিল- তবে শর্ত হলো, আপনার জন্মের দিনটি বাদে। দেখবেন, তিনি প্রথমে একটু অবাক হবেন, তারপর হয়তো এমন কোনো স্কুলজীবনের গল্প বা প্রথম চাকরি পাওয়ার দিনটার কথা বলবেন, যা আপনি আগে কখনো শোনেননি। এই একটি প্রশ্ন পুরো সন্ধ্যার আড্ডার রূপ বদলে দিতে পারে।
খাবারের মাধ্যমেও ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়। ইউটিউব দেখে বা বাসার বড়দের সাহায্য নিয়ে বাবার পছন্দের কোনো পদ নিজে রান্না করার চেষ্টা করা যেতে পারে। রান্না নিখুঁত না হলেও ক্ষতি নেই, আপনার এই আন্তরিক চেষ্টাটুকুই বাবার মনে দাগ কেটে যাবে। এছাড়া বিকেলে দুজনে মিলে একটু হাঁটতে বের হওয়া, চেনা কোনো দোকানে বসে চা খাওয়া কিংবা ঘরে বসে বাবার প্রিয় উত্তমকুমার বা রাজ্জাকের কোনো ক্ল্যাসিক সিনেমা একসাথে দেখা যেতে পারে। গান পছন্দ করলে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, হেমন্ত বা মান্না দের গান একসাথে শোনাও হতে পারে দারুণ এক অভিজ্ঞতা।
যাদের বাবা কাজের সূত্রে দূরে বা প্রবাসে থাকেন, তারা শুধু 'কেমন আছো' বলেই ফোন কেটে না দিয়ে আজ ভিডিও কলে একটু বেশি সময় দিতে পারেন। তাঁর শরীর, খাওয়া-দাওয়া ও দিনলিপি নিয়ে খুঁটিনাটি জানতে চাইলে তিনি বুঝবেন যে আপনি সত্যিই তাঁর খেয়াল রাখেন।
তবে দিনটি সবার জন্য আনন্দের নাও হতে পারে। যাদের বাবা আর ইহজগতে নেই, তাদের জন্য এই দিনটি ভীষণ কষ্টের। এমন কোনো বন্ধু থাকলে এই দিনে তার পাশে গিয়ে নীরবে দাঁড়ানো উচিত। আবার বাবার সঙ্গে যাদের সম্পর্ক একটু জটিল বা দূরত্বপূর্ণ, তাদের এই দিনে অপরাধবোধে ভোগার কিছু নেই। সম্পর্ক একদিনে বদলায় না, তবে এই বিশেষ দিনটি দূরত্ব কমানোর একটা নতুন শুরু তো হতেই পারে।
সর্বোপরি, বাবা দিবসের মূল শিক্ষা হলো বছরের প্রতিটি দিনই বাবার প্রতি যত্নশীল হওয়া। বাবা আসলে কোনো দামি জিনিস চান না; তিনি চান কেবল সন্তানের একটুখানি সঙ্গ এবং শ্রদ্ধা।