পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও কি সারাদিন ক্লান্ত লাগে? কাজ করতে ইচ্ছা করে না, শরীরে শক্তি পাওয়া যায় না কিংবা মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে? এমন সমস্যায় ভুগছেন অনেকেই। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনে নিয়মিত ক্লান্তি এখন নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ছয়জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় একজন জানিয়েছেন, অধিকাংশ দিনই তাঁরা শারীরিক বা মানসিক ক্লান্তিতে ভোগেন। অতিরিক্ত ঘুম বা বিশ্রাম নেওয়ার পরও এই ক্লান্তি সহজে কাটে না। অন্যদিকে, আরও অনেকেই জানিয়েছেন, তাঁরা মাঝেমধ্যে ক্লান্তি অনুভব করেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন জীবনে কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলে ক্লান্তি কমানো এবং কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
কতটা বেড়েছে ক্লান্তির সমস্যা?
সিডিসির গবেষণায় ২০২৪ সালের ন্যাশনাল হেলথ ইন্টারভিউ সার্ভের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে পরিচালিত এই জরিপে গত তিন মাসে কত ঘন ঘন ক্লান্তির লক্ষণ দেখা দিয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, প্রায় ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা ওই সময়ে অন্তত কিছুদিন ক্লান্তি অনুভব করেছেন। আর প্রায় ১৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ঘন ঘন ক্লান্তিতে ভোগেন।
নারীদের মধ্যে নিয়মিত ক্লান্তির হার ছিল ২০ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ১৩ শতাংশ। আমেরিকান ইন্ডিয়ান ও আলাস্কার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই হার ছিল ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ, যা অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। কম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও ঘন ঘন ক্লান্তির কথা জানানোর প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
নিয়মিত ক্লান্তিতে ভোগা ব্যক্তিরা শুধু সারাদিন দুর্বল বোধ করেন না, তাঁদের কাজকর্ম ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও বেশি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
তবে ক্লান্তির এই উচ্চ হার কেন দেখা যাচ্ছে, গবেষণায় তার নির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। অতীতের তুলনায় বর্তমানে মানুষ বেশি ক্লান্ত থাকেন কি না, সে সম্পর্কেও কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের ব্রিজপোর্ট হাসপাতালের ঘুমবিষয়ক চিকিৎসক ডা. জুবিন ভাম মনে করেন, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, মানুষের দৈনন্দিন কাজের চাপ এত বেড়েছে যে সব কাজ শেষ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। এর ফলে অনেকেই ঘুমের সময় কমিয়ে ফেলছেন।
দিনের ক্লান্তি কমাতে কী করবেন?
ক্লান্তি কমানোর জন্য প্রথমেই খাবার ও পানীয়ের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডা. জুবিন ভামের মতে, একবারে বেশি খাবার খেলে শরীরে ঝিমুনি ও ক্লান্তি বাড়তে পারে। বিশেষ করে প্রোটিনসমৃদ্ধ ভারী খাবারের পর এমন অনুভূতি দেখা দিতে পারে।
পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি। দিনের বিভিন্ন সময়ে শরীর থেকে যে পানি বেরিয়ে যায়, তা পূরণ করতে পানি সহায়তা করে। সাধারণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, নারীদের দৈনিক প্রায় ১১ দশমিক ৫ কাপ এবং পুরুষদের প্রায় ১৫ দশমিক ৫ কাপ পানি প্রয়োজন হতে পারে। তবে এই হিসাবের মধ্যে খাবার থেকে পাওয়া পানিও রয়েছে। ফলমূল ও শাকসবজির মতো খাবার থেকে দৈনিক পানির চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ হতে পারে। ব্যক্তিভেদে পানি প্রয়োজনের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
কাজের সময় খুব ক্লান্ত লাগলে কিছুক্ষণ শরীরচর্চা বা হাঁটাহাঁটি করার পরামর্শ দিয়েছেন মায়ো ক্লিনিকের ঘুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. ইয়াসেমিন তাশমান। তাঁর মতে, শরীরকে সচল রাখে এমন সাধারণ কিছু কাজও উপকার দিতে পারে। যেমন—কিছুক্ষণ হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রসারিত করার ব্যায়াম।
একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ঘাটতির পর ২০ মিনিটের মাঝারি থেকে তুলনামূলক বেশি তীব্রতার শরীরচর্চা স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। তবে ক্লান্তি কমাতে সব সময় কঠোর ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই।
ক্যাফেইন ও দিনের ঘুমে সতর্কতা
ক্লান্তি কাটাতে অনেকে চা-কফি পান করেন কিংবা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে নেন। তবে এ দুটি অভ্যাসই রাতের ঘুমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ডা. তাশমানের পরামর্শ, দিনের বেলায় ঘুমানোর প্রয়োজন হলে তা ২০ মিনিটের মধ্যে সীমিত রাখা ভালো। আর ঘুমানোর নির্ধারিত সময়ের অন্তত আট থেকে ১০ ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ রাখা উচিত। কারণ, ক্যাফেইনের প্রভাব দীর্ঘ সময় শরীরে থাকতে পারে এবং রাতে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।
ক্লান্তি নাকি ঘুমের অভাব—বুঝবেন কীভাবে?
সব ধরনের ক্লান্তির কারণ এক নয়। কখনো পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কারণে সারাদিন ঝিমুনি আসে। আবার কখনো পর্যাপ্ত ঘুমের পরও ক্লান্তি থেকে যায়, যা অন্য কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
ডা. তাশমানের মতে, রাতে ভালোভাবে ঘুমানোর পর সকালে সতেজ বোধ করছেন কি না, তা খেয়াল করা একটি উপায়। ভালো ঘুমের পর ক্লান্তি কেটে গেলে ঘুমের ঘাটতি এর কারণ হতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি অবসাদ থেকে যায়, তাহলে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে ঘুমের সময়ের পাশাপাশি ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ দীর্ঘ সময় বিছানায় থাকলেও ঘুমের মান ভালো না হলে শরীর সতেজ নাও হতে পারে।
ঘুমের পরিবেশে কিছু পরিবর্তন এনে ঘুমের মান উন্নত করা সম্ভব। যেমন, শোবার ঘর আরামদায়ক ও তুলনামূলক ঠান্ডা রাখা এবং উপযুক্ত গদি ব্যবহার করা। ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখাও সহায়ক হতে পারে।
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. ভাম। তাঁর মতে, ঘুমের সময়সূচি যতটা সম্ভব নিয়মিত রাখলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সুবিধা হয়।
কোনো রোগের লক্ষণও হতে পারে ক্লান্তি
জীবনযাপনের অভ্যাস পরিবর্তনের পরও ক্লান্তি না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ, কিছু রোগের উপসর্গ হিসেবেও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
ঘুমের সমস্যার মধ্যে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া, অনিদ্রা ও রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম ঘুমের স্বাভাবিক মান নষ্ট করতে পারে। ফলে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও দিনের বেলায় ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
এ ছাড়া রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা এবং কিছু অটোইমিউন রোগের কারণেও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন ডা. তাশমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ক্লান্তিকে অবহেলা না করে এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করা গেলে উপযুক্ত চিকিৎসা ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে উপকার পাওয়া সম্ভব।
সূত্র: হেলথ ডট কম