দ্রুত নগরায়ণ, ব্যস্ত জীবন আর পরিবার থেকে দূরে থাকার বাস্তবতায় চীনের অনেক প্রবীণ মানুষকে কাটাতে হচ্ছে নিঃসঙ্গতায়। সন্তান বা স্বজনেরা কাছে না থাকায় দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি কথা বলার মানুষও খুঁজে পান না অনেকে। এই একাকিত্ব দূর করতে চীনে গড়ে উঠছে নতুন ধরনের সেবা—যেখানে অর্থের বিনিময়ে প্রবীণদের পাশে থাকছেন প্রশিক্ষিত কর্মীরা। তাঁরা শুধু প্রয়োজনীয় কাজ করে দিচ্ছেন না, সময় দিচ্ছেন, গল্প করছেন, কখনো হাসপাতালে নিয়েও যাচ্ছেন।
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের ৯১ বছর বয়সী ইয়াং এমনই একজন প্রবীণ। দীর্ঘদিন ধরে একা থাকা এই বৃদ্ধ সম্প্রতি এমন একটি সেবা গ্রহণ করেছেন, যা তাঁর দৈনন্দিন জীবনে নতুন পরিবর্তন এনেছে। একসময় জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়লেও এখন তিনি কারও সঙ্গে সময় কাটানোর অপেক্ষায় থাকেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়াং একসময় তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই ভালো। কিন্তু নতুন সেবার কর্মীরা তাঁর বাড়িতে আসতে শুরু করার পর পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। তাঁরা তাঁর জন্য খাবার পৌঁছে দেন, ঘর পরিষ্কার করেন এবং কখনো কখনো শুধু পাশে বসে গল্প করেন।
এই সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নিজেদের ‘কমিউনিটি চিলড্রেন’ বা ‘সম্প্রদায়ের সন্তান’ হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের কর্মীরা প্রবীণদের নিজেদের মা-বাবার মতো যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে যাঁদের সন্তান বা পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকেন, তাঁদের জন্য এই সেবা সহায়ক হয়ে উঠছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মী লিও ইয়েন নিয়ান জানান, শুধু প্রবীণরাই নন, সেবাদাতাদেরও অনেক সময় একাকিত্বের অভিজ্ঞতা হয়। কাজ শেষে কথা বলার মানুষ না থাকা কিংবা প্রয়োজনের সময় কাউকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তাঁদের জীবনেও দেখা যায়।
এই অভিজ্ঞতা প্রবীণদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ককে আরও মানবিক করে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেবাটি কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও মানসিক সংযোগ।
চীনের বড় শহরগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করেন। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও উন্নত জীবনের সুযোগে অনেকেই পরিবার থেকে দূরে শহরে থাকেন। এর ফলে প্রবীণ মা-বাবার সঙ্গে সন্তানদের সরাসরি যোগাযোগ ও সময় কাটানোর সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়।
একই সঙ্গে নগরজীবনের ব্যস্ততা মানুষের সামাজিক সম্পর্কেও পরিবর্তন আনছে। আশপাশে অসংখ্য মানুষ থাকলেও নিয়মিত কথা বলার বা মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এমন বাস্তবতায় প্রবীণদের সঙ্গ দেওয়া, দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করা এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো সেবা নতুন চাহিদা তৈরি করছে। এই ব্যবসার প্রসার শুধু একটি বাজারের বিকাশ নয়; বরং পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক এবং বার্ধক্যে যত্ন পাওয়ার পরিবর্তিত বাস্তবতারও প্রতিফলন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সেবার গ্রাহকসংখ্যা বাড়ছে। ইয়াংয়ের মতো প্রবীণদের কাছে কর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি একাকিত্ব কমানোর একটি উপায় হয়ে উঠেছে।
যে মানুষটি দীর্ঘদিন নিঃসঙ্গতায় দিন কাটিয়েছেন, তাঁর জীবনে কখনো কখনো একজন অপরিচিত মানুষের সামান্য সময়ও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কিছুক্ষণ কথা বলা, প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা কিংবা মনোযোগ দিয়ে কারও কথা শোনা—এসব সাধারণ কাজই প্রবীণদের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
তবে অর্থের বিনিময়ে সঙ্গ দেওয়ার সেবা পরিবারের ভালোবাসা বা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সম্পর্কের বিকল্প নয়। বরং পরিবার থেকে দূরে থাকা মানুষের জন্য এটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।