দুই দশক পর ক্ষমতায় বিএনপি

আল-জাজিরার চোখে বিএনপির রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘ ২০ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম, দমন-পীড়ন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর এখন দেশ গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই বিজয়কে ‘বাংলাদেশের ডানপন্থার রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে উত্তরণ’ এবং ‘নতুন যুগের সূচনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

জনমানুষের আবেগ: রিকশাচালক আনোয়ারের গল্প
রাজধানীর গুলশানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এখন উৎসবের আমেজ। সেখানে দেখা মেলে ‘আনোয়ার পাগলা’ নামে এক রিকশাচালকের, যার রিকশার একপাশে জাতীয় পতাকা এবং অন্যপাশে বিএনপির দলীয় পতাকা। 

আনোয়ার আল-জাজিরাকে বলেন, ‘লোকে আমাকে পাগল বলে, কারণ আমি মনে করি এই দলই আমার জীবনের সবকিছু। তবে কে কী বলল তাতে কিছু যায়-আসে না। আমরা জিতেছি এবং বাংলাদেশ এখন আরও ভালো হবে।’

আনোয়ারের মতো লাখো সমর্থকদের কাছে এই বিজয় কেবল রাজনৈতিক জয় নয়, বরং এক দীর্ঘ দুঃশাসনের অবসান।

নির্বাচনি ফলাফল ও গেজেট প্রকাশ
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে, যা সরকার গঠনের চূড়ান্ত ধাপ। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও এক সময়ের মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। নির্বাচনের আগে ও পরে বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও ভোট গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলেও শেষ পর্যন্ত জামায়াত ফলাফল মেনে নিয়েছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও নতুন সরকারের অগ্রাধিকার
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে দেশ একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানই দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। মায়ের মৃত্যু এবং দীর্ঘ নির্বাসনের পর তাঁর নেতৃত্বে এই বিজয় দলটির জন্য এক বিশাল আবেগঘন মুহূর্ত। দলের প্রচার কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, তারেক রহমান নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে কর্মী-সমর্থকদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। গুলশান কার্যালয়ে উপস্থিত কামাল হোসেন নামে এক কর্মী বলেন, ‘শেখ হাসিনার শাসন কখনো শেষ হবে না বলে মনে হয়েছিল। এখন আমাদের দায়িত্ব অনেক। নতুন সরকারকে দ্রুত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মনোযোগ দিতে হবে।’

বিশেষজ্ঞদের চোখে ‘আসল পরীক্ষা’
বিজয় উদযাপনের মধ্যেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ‘জবান’ সাময়িকীর সম্পাদক রেজাউল করিম রনি মনে করেন, এই জয়ের মাধ্যমে দেশ একটি কট্টরপন্থী ধারায় ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে তাঁর মতে, ‘ভালো শাসন নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ২০২৪-এর গণআন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।’

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান একটি ভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের কারিগর ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের কাছে বিএনপি এখনো পুরোনো ধাঁচের এবং পরিবারতান্ত্রিক দল। তারা দুর্নীতি ও দমনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। 

কুগেলম্যান বলেন, ‘বিএনপি যদি পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যায় বা প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করে, তবে সংস্কারবাদীরা দ্রুতই হতাশ হবেন।’

ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
আঞ্চলিক রাজনীতিতে এই পরিবর্তনের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। কুগেলম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাকিস্তান হয়তো জামায়াতের জয় প্রত্যাশা করেছিল, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে চীন ও ভারত উভয়েই বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম। বিশেষ করে ভারত জামায়াতের চেয়ে বিএনপিকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে করে।

বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ঠিক পরেই এই বিজয় দলটির জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বিজয়ের এই মুহূর্তকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় করে রাখতে নাতি-নাতনিদের নিয়ে কার্যালয়ে আসা শামসুদ দোহার মতো প্রবীণ নেতাদের বিশ্বাস—স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশকে এখন সম্মিলিতভাবে গড়ে তোলার সময় এসেছে।