ঈদযাত্রায় সড়কে প্রাণ হারালো ২০৪ জন

প্রতি বছর দুই ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি যেন একপ্রকার নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার পথে লাশ হয়ে বাড়ি ফেরার মতো কষ্ট সহ্য করা কঠিন। আর যারা আহত হন তাদের জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ যন্ত্রণা। এবারের ঈদ উৎসবও অনেকের জীবনে বিষাদে রূপ নিয়েছে। 

নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা হোক কিংবা কর্মস্থলে ফেরার সময় রক্তাক্ত এক মিছিল কোনো অবস্থায় কাম্য হতে পারে না। এবারের ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে গত ৯ দিনে দেশের সড়ক, মহাসড়ক ও বিভিন্ন নৌপথে ছোট-বড় অসংখ্য দুর্ঘটনায় অকালে প্রাণ হারিয়েছেন ২০৪ জন। স্বজনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে অনেককে ফিরতে হয়েছে নিথর দেহ হয়ে। প্রতিবছর নিরাপদ ঈদযাত্রার নানা প্রতিশ্রুতি আর প্রশাসনের নজরদারির কথা বলা হলেও, গতির প্রতিযোগিতা আর অব্যবস্থাপনার বলি হয়ে সড়কে লাশের সারি দীর্ঘতর হওয়া যেন এক অমোঘ ও নির্মম নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, ঈদের সাত দিনের (১৭-২৩ মার্চ) ছুটিতে সারাদেশে ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন। তবে বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক হিসাবে, একই সময়ে ২৬৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২০৪ জন এবং আহত হয়েছেন ছয় শতাধিক মানুষ।

এদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির খসড়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ঈদযাত্রার ৯ দিনে ১৮৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৪ জন নিহত এবং ২০৫ জন আহত হয়েছেন। তবে কেবল সড়ক নয়, মৃত্যু হানা দিয়েছে রেল ও নৌপথেও। একই সময়ে ৭টি রেল দুর্ঘটনায় ৪২ জন এবং সাতটি নৌ দুর্ঘটনায় ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে এই ৯ দিনে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ২০৪ জনে। শুধু ঈদের দিন শনিবার রাত থেকে রোববার বিকেল পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৫ জন।

এবারের ঈদযাত্রায় সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার জাঙ্গালিয়া কচুয়া এলাকায়। গত রোববার ভোররাতে গেটম্যানের অনুপস্থিতিতে একটি যাত্রীবাহী বাস রেললাইনে উঠে পড়লে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেনটি সেটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাসটিতে থাকা ১২ যাত্রী প্রাণ হারান। যাত্রীদের মধ্যে সাত পুরুষ, তিন নারী ও দুই শিশু রয়েছে। এ ঘটনায় দুই গেটম্যানের চরম অবহেলাকে দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে।

অন্যদিকে, নীলফামারীগামী ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় রেলের অভ্যন্তরীণ তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রেললাইন মেরামতের কাজ চলায় লাল নিশান টাঙানো থাকলেও লোকোমাস্টার তা অমান্য করায় এ দুর্ঘটনা ঘটে, যাতে ট্রেনের ছাদে ও ভেতরে থাকা বহু যাত্রী আহত হয়। এ ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, এবারের দুর্ঘটনার সিংহভাগই ঘটেছে মোটরসাইকেল ও বেপরোয়া গতির বাসের কারণে। বিশেষ করে দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের মহাসড়কগুলোয় অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলারের অবাধ চলাচল এ মৃত্যুমিছিলকে আরও উসকে দিয়েছে। হবিগঞ্জের মাধবপুরে পিকআপ ভ্যান উল্টে চারজন এবং ফেনীর রামপুরে সংস্কারকাজের কারণে সৃষ্ট জটলায় দ্রুতগতির বাসের ধাক্কায় তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। ঈদের দিন ও পরবর্তী সময়ে দুর্ঘটনার বড় একটি অংশ দখল করে আছে মোটরসাইকেল। নতুন বাইক নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বের হওয়া বা দ্রুত চালানোর রোমাঞ্চ অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। কিশোরগঞ্জে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিন তরুণ, সুনামগঞ্জে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুই বন্ধু এবং ফরিদপুর ও মাদারীপুরে পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন কিশোর ও তরুণ। রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে ঠাঁই হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহতদের।

ঈদযাত্রার শুরুর দিকে সদরঘাটে দুই লঞ্চের সংঘর্ষে দুই যাত্রীর মৃত্যু সারাদেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। ‘আসা যাওয়া-৫’ লঞ্চে যাত্রী ওঠার সময় অন্য একটি লঞ্চের ধাক্কায় পিষ্ট হন ট্রলারে থাকা যাত্রীরা। এর বাইরেও নৌপথে আরও বেশ কিছু দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি নৌ এবং রেল দুর্ঘটনাগুলো অত্যন্ত অ্যালার্মিং। রেল ট্র্যাক মেইনটেন্যান্স বা সিগন্যাল ওভারলুক করার মতো ঘটনাগুলো আমাদের নজরদারির অভাবকে ফুটিয়ে তোলে।’ তারা আরও যোগ করেন যে, চালক সংকট এবং অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে চালকরা ক্লান্ত থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী খবর সংযোগকে জানান, ‘আমাদের মনিটরিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। সড়ক ও পরিবহনের এ পরিস্থিতি উত্তরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।’

ঈদ এলে দুর্ঘটনার চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুই ঈদের আগে ও পরের দিনগুলোয় বছরের অন্য সময়ের তুলনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ে। এর প্রধান কারণ বেপরোয়া গাড়িতে চালানো।
গবেষণা লব্ধ প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদের সময় সড়কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহায় দুর্ঘটনার হার বেশি হলেও, সামগ্রিকভাবে দুই ঈদেই প্রতিবছর প্রায় একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। তাই এ সময় সড়ক ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষকে বাড়তি নজর দেওয়ার সুপারিশ করা হয় গবেষণায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রধানত ৫টি কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বেপরোয়া গাড়ি চালানোই সবচেয়ে বড় কারণ, যা ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। সড়কের নাজুক অবস্থা ২৯ শতাংশ, পথচারী পারাপারের জেব্রা ক্রসিং না থাকায় ১৯ শতাংশ, যান্ত্রিক ত্রুটিতে ৫ শতাংশ, চালকের নেশাগ্রস্ততা ৩ শতাংশ এবং ২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বিভ্রান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে।

বাসের চালকরা জানান গাড়িচালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালানোর কারণে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ক্লান্ত শরীরে গাড়ি চালানোর কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। তার দাবি, দুর্ঘটনার জন্য কেবল চালক দায়ী নন, পথচারীদের কারণেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সড়কে দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা পথচারীকে চাপা দেওয়ার। এরপরই রয়েছে একটি গাড়ির পেছনে আরেকটি গাড়ির ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা। এমন ঘটনা মোট সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার ২৪ শতাংশ। দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ১৭ শতাংশ। 

এ ছাড়া চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর জন্য ১২ শতাংশ, থেমে থাকা গাড়ি ধাক্কা দেওয়ায় ৭ শতাংশ, চলন্ত দুটি গাড়ির পাশাপাশি সংঘর্ষের জন্য ১১ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। 

গবেষণায় দেখা যায়, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ শতাংশ আতঙ্কে, ১৯ শতাংশ ট্রমায় ভোগেন। ১৭ শতাংশ আত্মবিশ্বাস হারান, ১২ শতাংশ হতাশায় ও ১২ ভাগ নানা মানসিক সমস্যায় ভোগেন। এ ছাড়া শারীরিক ব্যথাসহ নানা সমস্যা তো রয়েছেই। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৮ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনাকে একটি গুরুতর সমস্যা বলে মনে করেন। বাকি ২ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনাকে প্রধান সমস্যা মনে করেন না।

গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ পুরুষ, ২৫ শতাংশ নারী ও ৩৬ শতাংশ শিশু। পেশাগত দিক থেকে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ২৯ শতাংশ ব্যবসায়ী। এরপর রয়েছে বেকার ১২ শতাংশ, গাড়ির চালক ১১ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৩২ শতাংশের মাসিক আয় ৫ হাজার টাকার নিচে। ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করতেন ২৮ শতাংশ। গবেষণায় দেখা যায়, দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর ৯৬ শতাংশই বলেছে, পরিবারে আহতদের মধ্যে কর্মসক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনের প্রয়োগ, উচ্চ দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়াসহ বেশ কিছু সুপারিশ করা হয় গবেষণা প্রতিবেদনে।