মার্কিন আগ্রাসনে জড়িত আমিরাতকে গুড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে যে আগ্রাসন চালাচ্ছে এতে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সরাসরি জড়িত বলে তেহরান বিশ্বাস করে। এক সাক্ষাৎকারে ইরানের দুটি উচ্চপদস্থ সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। 

তারা বলছে,আমিরাত ইরান-বিরোধী মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। কোনো ধরনের স্থল অভিযান শুরু হলে আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর ব্যাপক হামলা চালানো হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছে।

এক মাস ধরে চলা এই সংঘাত বিশ্ববাজারকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির কৌশলগত দ্বীপগুলো দখলের জন্য স্থলসেনা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছেন, যাতে জ্বালানি সরবরাহে ইরানের বাধা দেওয়ার সক্ষমতা খর্ব করা যায়।

বিশেষ করে খারগ দ্বীপ (যেখান দিয়ে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়) এবং প্রণালির ওপর নজরদারি রাখা কেশম দ্বীপের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ধারণা করা হচ্ছে, এ ধরনের হামলা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো থেকে পরিচালিত হতে পারে। ইতোমধ্যে এসব দেশ ইরানি পাল্টা হামলার শিকার হয়েছে, যা মূলত ইরানজুড়ে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়া ছিল। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৯০০ জন নিহত হয়েছে।

এদিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে ইরান-বিরোধী মনোভাব বাড়ছে, কারণ ইরানের পাল্টা হামলায় সেসব দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র আমিরাত থেকে বিশেষভাবে আক্রমণাত্মক বক্তব্য আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত আমিরাতের রাষ্ট্রদূত এই সপ্তাহে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এ একটি কলামে লিখেছেন যে, কেবল একটি যুদ্ধবিরতিই ‘যথেষ্ট’ হবে না; বরং যুদ্ধমান পক্ষগুলোর উচিত এমন একটি ‘চূড়ান্ত পরিণতির’ দিকে যাওয়া যা ‘ইরানের সব ধরনের হুমকি নির্মূল করবে’।

এমনকি ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ প্রতিবেদন করেছে যে, কিছু উপসাগরীয় আরব দেশ ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।

তবে ইরানের একজন সিনিয়র নিরাপত্তা কর্মকর্তার মতে, তেহরানের নেতারা এখন বিশ্বাস করেন যে ইউএই যুদ্ধের শুরু থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। 

ওই কর্মকর্তা জানান, ইরানি নেতৃত্ব ‘আবুধাবির প্রতি কয়েক সপ্তাহের সহনশীলতা শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, আমিরাতের ভূমিকা কেবল মার্কিন সামরিক স্থাপনা পরিচালনা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই (যেগুলো ইতোমধ্যে ইরানের পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে)।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্বাস করে যে, ইউএই তাদের নিজস্ব কিছু বিমানঘাঁটিও ইরানের বিরুদ্ধে অপারেশনের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

তিনি আরও জানান, আবুধাবি এ অঞ্চলে ইসরাইলি স্বার্থ রক্ষার একটি উন্নত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। তার দাবি অনুযায়ী, এর মধ্যে ‘প্রতারণামূলক অভিযান’ অন্তর্ভুক্ত ছিল—যেমন ওমান এবং অন্য অন্তত একটি দেশে ইসরাইলের ছদ্মবেশী হামলা, যাতে সেগুলোকে ইরানের কাজ বলে মনে হয়।

তিনি বলেন, তেহরান মূল্যায়ন করেছে যে, ‘সহযোগিতার অংশ হিসেবে ইউএই-র ভেতরে উন্নত এআই অবকাঠামো ব্যবহার করে মার্কিন ও ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের জন্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ইরানি ব্যক্তিত্ব ও স্থাপনার তথ্যও রয়েছে।’

ওই কর্মকর্তা আরও যোগ করেন যে, আমিরাতের ভূখণ্ড থেকে ইরানি জাহাজ, ছোট নৌকা বা উপকূলীয় অঞ্চলে যেকোনো আক্রমণকে এখন তেহরান একটি বড় ধরনের উস্কানি হিসেবে গণ্য করবে, যার ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে।

আসন্ন হামলার আশঙ্কা

ইরানের এক পৃথক সিনিয়র কূটনৈতিক কর্মকর্তা জানান, তেহরান বিশ্বাস করে একটি মার্কিন স্থল অভিযান এখন আসন্ন হতে পারে। তিনি বলেন, রাশিয়াসহ ইরানের মিত্র দেশগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে করা গোয়েন্দা মূল্যায়ন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইউএই থেকে এই হামলা চালানো হতে পারে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয় (যুদ্ধের আগে যেখান দিয়ে বিশ্বের ৩০ শতাংশ তেল পরিবহন করা হতো), তবে তিনি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেবেন। তবে এরপর থেকে তিনি দুবার এই হামলা পিছিয়ে দিয়েছেন; কারণ হিসেবে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির আলোচনার কথা বলা হয়েছে যা বোমাবর্ষণ বন্ধ করবে এবং তেল সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক করবে।

তবে ওই কূটনীতিক জানান, ইরান বর্তমান এই বিলম্বকে প্রকৃত কূটনৈতিক বিরতি হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন এবং যুদ্ধের নতুন পর্যায়ের প্রস্তুতির জন্য একটি ছদ্মবেশ বা সময়ক্ষেপণ হিসেবে দেখছে।

রয়টার্স এই সপ্তাহে জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যে বিদ্যমান বিশাল মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে আরও হাজার হাজার সৈন্য পাঠানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

যখন ১৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো 'সাউথ পার্স' গ্যাস ফিল্ডে বোমা হামলা চালায়, তখন তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে এর জবাব দেয়।

যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের হোটেল, বিমানবন্দর, ডাটা সেন্টার, বন্দর এবং দূতাবাসগুলোতেও মিসাইল ও ড্রোন আঘাত হেনেছে।

তবে ওই কূটনীতিক জানিয়েছেন যে, ইরান এখন পর্যন্ত যেসব দেশ থেকে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে, তাদের পুরোপুরি শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা থেকে সচেতনভাবে বিরত রয়েছে।

সেই কারণে, তেহরান কেবল সরাসরি মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু বা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত গোয়েন্দা কেন্দ্রগুলোতে (যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের বেসামরিক এলাকায় অবস্থিত কিছু স্থাপনাও রয়েছে) হামলা সীমাবদ্ধ রেখেছে।

সেই কূটনীতিক সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই সংযম ‘তৎক্ষণাৎ শেষ হয়ে যাবে যদি কোনো স্থল অভিযান শুরু হয় অথবা যদি ইরানের কোনো ভূখণ্ড বা কোনো দ্বীপ স্থল হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়।’

তিনি বলেন, যে দেশ থেকে এই ধরনের হামলা চালানো হবে, ইরান অবিলম্বে সেই দেশকে শত্রু  হিসেবে গণ্য করবে।

তিনি আরও বলেন, ‘তখন ইরানি হামলা কেবল সামরিক বা গোয়েন্দা স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট স্বার্থগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে। এর মধ্যে আমিরাতের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ রয়েছে এমন বাণিজ্যিক ও স্থাবর সম্পত্তিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’

কূটনীতিক আরও যোগ করেন, ‘আগ্রাসন শুরু হলে আগের কোনো নিয়মই কার্যকর থাকবে না। যদি কোনো দেশ ইরানের এক টুকরো ভূখণ্ড দখলেও অংশ নেয়, তবে সেই দেশকেও আক্রমণকারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে।’

তিনি জানান, এই বার্তা ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই।