সম্প্রতি শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলছে। গত শুক্রবার (২২ মে) রাত পৌনে ৯টার দিকে কলাবাগান এলাকার নর্থ সার্কুলার রোডের একটি বাড়িতে এক শিশুকে চকলেট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ষাটোর্ধ্ব এক প্রতিবেশীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার মরদেহের একটি অংশ পাওয়া যায় প্রতিবেশীর ঘরের খাটের নিচে এবং মাথা উদ্ধার করা হয় বাথরুম থেকে। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পালাতে সহায়তা করেছেন তার স্ত্রীও।
এছাড়া গত ১৬ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার চান্দের চর গ্রামের মদিনাপাড়ায় আছিয়া আক্তার নামে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। নিহত শিশুর গলায় শ্বাসরোধের চিহ্ন এবং ধর্ষণের প্রাথমিক আলামত পাওয়ার পর পুলিশ অভিযুক্ত রাজা মিয়াকে (৪৫) আটক করে।
গত কয়েক মাসে দেশে এসব ঘটনা ঘটে চলছে। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের গত সাড়ে চার মাসে (জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত) সারা দেশে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
আসকের তথ্যমতে, এই একই সময়ে ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে অন্তত আরও ৪৬ শিশু। এছাড়া ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে অন্তত ১৭ শিশুকে। এর মধ্যে শুধু গত দুই সপ্তাহেই হত্যার শিকার হয়েছে ৪টি শিশু। প্রতিটি ঘটনাই সমাজে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এসব ঘটনা সত্যিই উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু শুধু ভয় পেলেই চলবে না, সচেতন হতে হবে। নিচে কিছু জরুরি বিষয় তুলে ধরা হলো-
অভিভাবক যা করবেন
- সন্তানের চলাফেরার খোঁজ রাখুন – সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে যায়, কখন ফিরবে—তা জানুন।
- পথচলার নিয়ম শেখান – রাস্তা পারাপার, সিগন্যাল মেনে চলা, অচেনা গাড়িতে না ওঠা—এসব শেখান ছোটবেলা থেকেই।
- অচেনা ব্যক্তির বিষয়ে সতর্ক করুন – কখনো অচেনা কারও কথা মতো যাবে না, কোনো উপহার নেবে না, গাড়িতে উঠবে না।
- জরুরি নম্বর মুখস্থ করান – বাবা-মায়ের মোবাইল নম্বর, পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্সের নম্বর জানা থাকা জরুরি।
- স্কুল ও বাড়ির রুটিন জানুন – সন্তানের স্কুলের সময়, কোচিংয়ের সময়, কোন পথে ফেরে—সব জানুন।
বিদ্যালয় যা করবে
- স্কুলের আশপাশে নিরাপত্তা বাড়ান – সিসি ক্যামেরা, নিরাপত্তারক্ষী, পরিচিত ব্যতীত স্কুল গেটে কাউকে না আসার ব্যবস্থা।
- সচেতনতা ক্লাস নেওয়া – নিয়মিত শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ক ক্লাস ও মহড়া দেওয়া।
- অভিভাবকদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা – স্কুল থেকে অভিভাবকদের সচেতন করা ও হেল্পলাইন নম্বর দেওয়া।
শিশু যা করবে
- চিৎকার করতে শিখুন – বিপদে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করবে।
- কাছের মানুষ ছাড়া কারও সঙ্গে যাবে না – মা-বাবা, স্কুলের নির্দিষ্ট গাড়ি, চেনা লোক ছাড়া কারও সঙ্গে যাবে না।
- কান্নাকাটি বা সাহায্য চাইতে দ্বিধা করবে না – কেউ ধরে নিয়ে গেলে দৌড়াবে, লাথি মারবে, চিৎকার করবে।
সমাজ ও সরকার যা করবে
- কঠোর আইন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা – শিশু অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি ও দ্রুত বিচার।
- পথ ও স্কুল এলাকায় আলো ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন – নিরাপদ পথ নিশ্চিত করা।
- জাতীয় টোল-ফ্রি হেল্পলাইন চালু রাখা – ১০৯৮ (শিশু হেল্পলাইন) এর মতো নম্বর সবাই জানবে ও ব্যবহার করবে।
শিশু নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। সবাই সচেতন হলে, পাশের শিশুটির দিকে খেয়াল রাখলে, রাস্তায় কোনো সন্দেহজনক ঘটনা দেখে চুপ না থেকে পুলিশ বা হেল্পলাইনে জানালে—অনেক দুর্ঘটনা আটকানো সম্ভব।