হাম ও উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১০৩২

দেশজুড়ে কোনোভাবেই থামছে না মহামারি আকার ধারণ করা হামের প্রকোপ। দিন দিন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায়ও হাম ও এর উপসর্গে দেশে আরও তিনটি শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার (৬ জুন) সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই প্রাণহানি ঘটে। 

এ নিয়ে গত কয়েক মাসে হাম ও হামের উপসর্গে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১৩ জনে। একই সময়ে নতুন করে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে আরও ১ হাজার ৩২ জন শিশু, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হামবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া তিন শিশুর মধ্যে দুজনই রাজধানী ঢাকার এবং অন্য শিশুটি সিলেট অঞ্চলের। অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের প্রকোপ মারাত্মক রূপ নিতে শুরু করে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময়ে কেবল হামের উপসর্গ নিয়েই প্রাণ হারিয়েছে ৫২২টি শিশু। এছাড়া ল্যাবরেটরি টেস্টে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে আরও ৯১ জন শিশু।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত শিশুদের শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশি থেকে অন্য শিশুরা সহজেই এতে সংক্রমিত হতে পারে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও পুষ্টির অভাব হলে এই রোগ নিউমোনিয়া বা মারাত্মক ডায়রিয়ার রূপ নিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেশের বর্তমান হাসপাতালগুলোর চিত্র বলছে, আক্রান্তের সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হাসপাতালে রোগীর চাপ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট ৭৭ হাজার ৭৯১টি শিশুর শরীরে হামের বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিয়েছে। আক্রান্তের তীব্রতা বেশি থাকায় এদের মধ্যে একটি বড় অংশকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। সরকারি হিসাবে, এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৩ হাজার ১৩৪টি শিশু। তবে আশার কথা হলো, চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আক্রান্তদের একটি বড় অংশ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছে। এখন পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে ৫৮ হাজার ৯৬৪টি শিশু। বাকিরা এখনও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, কেবল উপসর্গই নয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। গত ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে মোট ৯ হাজার ৬২০টি শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের উপস্থিতি বা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এমআর (হাম ও রুবেলা) টিকা না দেওয়া বা বাদ পড়ার কারণেই মূলত এই ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল এবং শহরের বস্তি এলাকাগুলোতে টিকাদানের হার কম হওয়ায় সেখানে সংক্রমণের তীব্রতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি যদি কোনো শিশুর শরীরে তীব্র জ্বর, চামড়ায় লালচে দানা বা র‍্যাশ, সর্দি-কাশি কিংবা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত তরল খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।