দেশের শিল্পায়ন, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণয়ন করা হচ্ছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। এই লক্ষ্যে সরকার দেশীয় উৎপাদনমুখী শিল্পকে বিকশিত করতে নজিরবিহীন করছাড়, ভ্যাট অব্যাহতি এবং আমদানি শুল্কে বড় ধরনের সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে।
এছাড়াও এবারের বাজেটের মূল ভিত্তি হচ্ছে ‘উৎপাদনমুখী করনীতি’। অর্থাৎ, যারা দেশের অভ্যন্তরে পণ্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থান তৈরি করবে তারা বিশেষ সুবিধা পাবে, আর আমদানিনির্ভর ও বিলাসী পণ্যের ওপর করের বোঝা বাড়বে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকটের এই সময়ে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকারের এই করনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নতুন বাজেটের প্রস্তাবনার কারণে যেসব খাতের পণ্যের দাম কমতে পারে, তার একটি সুনির্দিষ্ট বিবরণ নিচে দেওয়া হলো -
ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি পণ্য
এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় প্রণোদনা পাচ্ছে দেশীয় ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল শিল্প। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফ্রিজ, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার (এসি), ওয়াশিং মেশিনসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সাথে এসব পণ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড়ের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে, যা উৎপাদন খরচ কমিয়ে ক্রেতাদের সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কেনার সুযোগ করে দেবে।
কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রসারে দেশে উৎপাদিত ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর ও মোবাইল ফোনের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা আরও কয়েক বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এছাড়া কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, প্রিন্টার ও ফ্ল্যাশ মেমোরি উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর থেকে অগ্রিম কর কমানো হচ্ছে। পাশাপাশি মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতেও করহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব রয়েছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী
মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে ধান, চাল, গম, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের উৎসে কর কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমানে এসব পণ্যে ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎসে কর চালু রয়েছে, যা নতুন বাজেটে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ (০.৫) শতাংশ করা হতে পারে। এছাড়া দেশীয় তৈলবীজ থেকে উৎপাদিত ভোজ্যতেলে ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতির পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ
চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে সাধারণ ও মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে আনতে ওষুধ তৈরির ৬৮ ধরনের কাঁচামালের ওপর থেকে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হতে পারে। এর পাশাপাশি হৃদরোগীদের হার্টের রিং, চোখের লেন্স এবং ক্যান্সারের বেশ কিছু জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আমদানিতে ভ্যাট ও কর রেয়াতের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর থেকে আগাম কর তুলে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ (সোলার) ও ব্যাটারি খাতে দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সৌর বিদ্যুতের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতির মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে করমুক্ত সুবিধা ২০৫৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সামগ্রিক খরচ কমবে।
ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়ি
পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) ও ই-বাইক উৎপাদনে বিশেষ কর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি ইভি চার্জিং স্টেশন, বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাকের কর শূন্য করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া হাইব্রিড গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের চিন্তাভাবনা করছে সরকার।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ডিজিটাল মাধ্যম
ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে বড় সুখবর পাচ্ছেন অনলাইন সৃজনশীল পেশাজীবীরা। ইউটিউবার ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের ওপর বর্তমানে থাকা সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট এবং ৭ শতাংশ আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্বর্ণ ও অলঙ্কার
স্বর্ণ বিক্রির ক্ষেত্রে বর্তমানে চালু থাকা শতাংশভিত্তিক ভ্যাটের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এই নিয়ম কার্যকর হলে প্রতি ভরি স্বর্ণে ভ্যাটের পরিমাণ অনেকটাই কমে আসবে, যা ক্রেতাদের খরচ কমাবে এবং বাজারে স্বচ্ছতা আনবে।