সাইবার সুরক্ষা আইনে আসছে পরিবর্তন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাইবার স্পেসে ছড়িয়ে পড়া গুজব, মানহানিকর কনটেন্ট এবং ভুয়া তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে বিদ্যমান ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংশোধনের বড় উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর অডিও, ভিডিও ও ছবি ছড়ানো প্রতিরোধ আইনে নতুন ও কঠোর বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

গত সোমবার, ৮ জুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে বিদ্যমান আইনের কয়েকটি ধারা পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে ক্ষতিকর ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অপসারণ করতে বাধ্য করার মতো আইনি কাঠামো এই সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগের ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’ রহিত করে একটি নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেই অধ্যাদেশটিই ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ হিসেবে পাস হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরির পরিমাণ ব্যাপকভাবে বাড়লেও বর্তমান আইনে এই ধরনের সুনির্দিষ্ট অপরাধের জন্য পর্যাপ্ত শাস্তির বিধান নেই। ফলে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে এই অপরাধগুলো বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সম্প্রতি দেশের সরকারপ্রধান, তার পরিবার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবারসহ সমাজের বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাধীনতার নামে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে যেসব কনটেন্ট ভার্চুয়াল মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে, সেটিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজনীয়তা দেখছে সরকার।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সাইবার অপরাধের পরিধি ও শাস্তির ক্ষেত্রে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চুয়াল মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সব অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে 'সাইবার স্পেস'-এর নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে। সংশোধিত এই আইনে গুজব, অপতথ্য, মানহানি এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্বারা তৈরি অপমানজনক ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার প্রতিরোধে নতুন শাস্তির বিধান সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি জায়ান্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং রিপোর্ট করা কনটেন্ট অপসারণ প্রক্রিয়াকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে সময়সীমাভিত্তিক কন্টেন্ট অপসারণের নিয়ম চালুর বিধানও এতে যুক্ত করা হচ্ছে।

বর্তমানে কোনো মানহানিকর বা ভুয়া তথ্য ইন্টারনেটে ছড়ালে পুলিশ বা বিটিআরসি সেগুলো কেবল 'ডাউন' করতে পারে, তবে ফেসবুক বা ইউটিউব থেকে সব সময় পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, মেটা বা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো চুক্তি না থাকায় তারা অনুরোধে সহজে সাড়া দেয় না।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা জানান, মেটা সাধারণত চাইল্ড পর্নোগ্রাফি, সেক্সটর্শন বা জঙ্গিবাদের মতো গুরুতর বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিলেও সাধারণ মানহানি বা রাজনৈতিক কনটেন্ট সরাতে চায় না। মেটার মতো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আইনি সহযোগিতা পেতে 'এমল্যাট' বা মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স ট্রিটি থাকা প্রয়োজন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নির্বাচিত সরকার না থাকায় মেটা কোনো চুক্তি করতে রাজী হয়নি। তবে নতুন আইন সংশোধনের পর এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আইনি পথ তৈরি হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এই আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষই বিভিন্ন ধরনের গুজব ও অপপ্রচার চালাচ্ছে, যা বন্ধ হওয়া উচিত।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বিএম মইনুল হোসেন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় দেশে বিরোধী মত বা বিরোধী দলকে দমানোর জন্য এই ধরনের আইনের আশ্রয় নিয়ে ব্যবহারকারীর সব তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যা ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে। তাই বিশেষজ্ঞরা এই আইনের সংশোধনীর পাশাপাশি এর রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধের নিশ্চয়তা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের তথ্যের সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। সূত্র: বিবিসি