চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সামার দাভোস-২০২৬ কে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিদেশ সফরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন তার উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) দালিয়ানে আয়োজিত এক প্রেস কনফারেন্সে তিনি জানান, সমতা, ন্যায্যতা ও ভারসাম্যের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা, সম্মান ও দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করছেন প্রধানমন্ত্রী। এই সফর কাভার করতে ঢাকা ও মালয়েশিয়া থেকে দালিয়ানে আসা সাংবাদিকদের প্রতি তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মুখপাত্র জানান, সোমবার রাতে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে দালিয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ ২১ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। এই দলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার আটজন রয়েছেন, যারা সীমিত পরিসরে বহুপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরছেন।
বিমানবন্দরে চীনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীকে লাল গালিচা সংবর্ধনা জানিয়ে মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে হোটেলে পৌঁছে দেয়। চীনের এই সম্মাননার জন্য তিনি দেশটির সরকারকে ধন্যবাদ জানান। এর আগে মালয়েশিয়া সফরে স্বল্প সময়ের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও রাজাসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন।
মাহদী আমিন আরও জানান, চীনে এসে প্রধানমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং বহুপাক্ষিক বিষয়ে বৈশ্বিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। ডব্লিউইএফ আয়োজিত ‘Innovating at Scale’ প্রতিপাদ্যের এই সামার দাভোসে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি উদ্ভাবক, শিক্ষাবিদ ও করপোরেট নেতারা অংশ নিচ্ছেন। একজন সরকার প্রধান হিসেবে এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈশ্বিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ, যার মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নকে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের সঙ্গে যুক্ত করা। ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’—এই বার্তার মাধ্যমে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আস্থাশীল ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে। সম্মেলনের পাশাপাশি ডব্লিউইএফ প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জুইংগি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন, যেখানে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার প্রশংসা করাসহ বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা হয়।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী ডব্লিউইএফ’র “ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ” শীর্ষক সেশনে বক্তব্য রাখেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারভিত্তিক পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনঃখনন, পদ্মা ও তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, সবুজ শিল্প বিকাশে পাট শিল্প ও পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যানবাহন চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। জলবায়ু কার্যক্রমকে কোনো ব্যয় নয়, বরং সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (Loss and Damage Fund) কার্যকর বাস্তবায়ন, জলবায়ু অর্থায়ন সহজলভ্য করা এবং অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সংহতি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ দায়িত্বের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান।
এদিকে, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে আয়োজিত নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বস্ত্রীক অংশ নিচ্ছেন। এই আয়োজনে দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, গিনি, মন্টেনিগ্রো ও কাজাখস্তানের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে তার উপস্থিতি ও আলাপচারিতার বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়েছে। সফরের পরবর্তী সূচি অনুযায়ী, বুধবার সকালে “অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স”-এ অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর দুপুরে দালিয়ান থেকে হাই স্পিড ট্রেনে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা দেবেন এবং সেখানে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হবেন।
প্রেস কনফারেন্সের সমাপ্তিতে মাহদী আমিন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দেশে যেমন আস্থা অর্জন করেছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থান তৈরি করেছেন। সমতা, ন্যায্যতা ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব ও জনগণের স্বার্থকে কার্যকরভাবে তুলে ধরছে। দালিয়ানে ডব্লিউইএফ সামার দাভোসে এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতা আরও বাড়াবে।