আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে বলে মন্তব্য করে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দলটি বাংলাদেশে আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না। তিনি জানান, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষে শিগগিরই দলটিকে বিচারের কাঠগড়ায় নেওয়া হবে।
শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন ঘটেছে এবং দলটি রাজনৈতিকভাবে নিপাত ও নির্মূল হয়েছে। তার ভাষায়, “আওয়ামী লীগের দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না।”
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি শুধু সরকারের নয়, জনগণেরও। তদন্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দলটির বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম শুরু করা হবে।
তিনি জানান, সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের বিচার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত আইনি কাঠামোতেও রাজনৈতিক দলের বিচার করার বিধান রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়ে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
জুলাই আন্দোলনের চেতনা নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতারও সমালোচনা করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনা যেন কেউ রাজনৈতিক ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে। তাঁর দাবি, অতীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে যারা রাজনীতি করেছে, তাদের পরিণতি আজ সবার সামনে স্পষ্ট।
জুলাই আন্দোলনে নিহতদের প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ৫ আগস্ট বিজয় অর্জিত হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের বিচারে নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, যুবদল এবং বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
নিহতের সংখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহতের কথা উল্লেখ থাকলেও বিভিন্ন গণমাধ্যম ও জরিপে ৭০০ থেকে ৮০০ জনের তথ্য পাওয়া যায়। অনেক শহীদের তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি বলে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, অনেক হাসপাতালের নথিপত্র গায়েব করে দেওয়া হয়েছে এবং অনেককে ওয়ারিশবিহীন লাশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এমনকি আজও অনেক পরিবার তাদের স্বজনের কবরের অবস্থান জানে না।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এত বড় গণহত্যার অভিযোগের পরও তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই। বরং জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন এবং বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিচার কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত হত্যা, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি মামলার রায় ইতোমধ্যে হয়েছে। আরও ২৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং ৭২টি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি আরও জানান, শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুইজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যসহ কয়েকজন বিভিন্ন মেয়াদের সাজা পেয়েছেন। গণহত্যার একটি মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনা, চানখারপুল হত্যা এবং রামপুরার একটি হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন মামলার রায়ের কথাও তুলে ধরেন।
শহীদ পরিবারের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতার কথা পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ ও আইনানুগভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।