বিএনপি সরকার গঠনের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও জাতীয় সংসদের ৫০টি কমিটির মধ্যে গঠিত হয়েছে মাত্র ১৫টি। মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকি ও জবাবদিহির আওতায় রাখতে কাজ করে সংসদীয় কমিটিগুলো। তাই কমিটি গঠনে দেরি হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের কাজে জবাবদিহির জায়গায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যদিও বিধান অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম তিন অধিবেশনের মধ্যে কমিটিগুলো গঠনের সুযোগ আছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, সংসদীয় কমিটি গঠনে দেরি হওয়ার অর্থ হচ্ছে সরকারি কর্মকাণ্ড তদারকিতে এক ধরনের বিলম্ব ঘটছে। তবে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সব কমিটি শিগগির গঠিত হবে।
জাতীয় সংসদের সংসদীয় কমিটি রয়েছে ৫০টি। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি আছে ৩৯টি এবং বিষয়ভিত্তিক কমিটি ১১টি। এখনো পর্যন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে ১৫টি। এর মধ্যে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ৯টি এবং বিষয়ভিত্তিক কমিটি ৬টি।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংসদীয় কমিটির প্রধান দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা, অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করা। বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়া বা সুপারিশ করাও সংসদীয় কমিটির কাজ। নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহি করতে কমিটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পরে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদে ক্ষমতাসীনদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। তাই ওই দুই মেয়াদে সরকারি ও বিরোধী দলের মতবিরোধের কারণে সংসদীয় কমিটি গঠন করতে দেরি হয়।
২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর অষ্টম জাতীয় সংসদেও সংসদীয় কমিটি গঠন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছিল। সে সময় সব সংসদীয় কমিটি গঠনের জন্য কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা ছিল না। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নতুন সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যে সংসদীয় কমিটিগুলো গঠনের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়।
২০০৯ সালের নবম জাতীয় সংসদ থেকে সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দল ও জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। ফলে ২০০৯ সাল থেকে সংসদীয় কমিটিগুলো প্রথম বা দ্বিতীয় অধিবেশনেই করা হয়েছিল। কিন্তু এবারই তা তৃতীয় অধিবেশনে গড়াচ্ছে। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে সংসদের আগামী অধিবেশনেই কমিটিগুলো গঠন করতে হবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের মধ্যে সংসদীয় কমিটিগুলো হলে ভালো হতো। তাহলে সরকারের কর্মকাণ্ডগুলো তদারকি ও বিচার-বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতো। মন্ত্রণালয়ের কাজে জবাবদিহি আনা কমিটিগুলোর দায়িত্ব। কমিটি গঠন না হওয়ায় সেটা সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না।
এ ছাড়া কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, প্রতি মাসে প্রতিটি সংসদীয় কমিটির ন্যূনতম একটি করে বৈঠক হতে হয়। কিন্তু সেটিও ঠিকমতো হয় না। গত ১০ জুন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গঠন হলেও এখনো পর্যন্ত একটিও বৈঠক হয়নি। এরই মধ্যে এ কমিটির সভাপতি আবদুল মঈন খান গত শনিবার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। গত জুলাই মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ও সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন হয়।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের দুই দিকেই সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর সময়সীমা বা বাধ্যবাধকতা নেই। দ্বিতীয়ত, কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার পর সরকারেরও জবাব দেওয়ার স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই। এতে সংসদীয় জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ অংশটি দুর্বল থেকে যায়। এই ঘাটতি জরুরি ভিত্তিতে দূর করা দরকার।