বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে একটি জরুরি প্রশ্ন মনে আসাই স্বাভাবিক, এই মুহূর্তে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নতুন ‘সামাজিক সুরক্ষা কার্ড’ বা ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্যান্য কার্ড বিতরণ করা কি আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল? নাকি এর চেয়েও জরুরি অনেক বিষয় কার্ডের কারণে এই মুহূর্তে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে?
নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রান্তিক মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এর প্রয়োজনীয়তা এবং কার্যকারিতা নিয়ে কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। কার্ড এই মুহূর্তে জরুরী কেন ছিল না সেটা বলি-
১. কার্ডের ছড়াছড়ি বনাম একক সুসংগঠিত ডেটাবেজ: আমাদের দেশে ইতিমধ্যে টিসিবি কার্ড, ভিজিডি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নানা ধরণের কার্ড চালু রয়েছে। একটি নতুন কার্ডের পেছনে বিশাল প্রশাসনিক ব্যয় ও অবকাঠামোগত খরচ করার চেয়ে সব সুযোগ-সুবিধাকে একটি একক ন্যাশনাল আইডি (NID) বা ডিজিটাল স্মার্ট কার্ডের অধীনে আনা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর হতো। আমরা শুধু নতুন নতুন কার্ডের সংখ্যাই বাড়াচ্ছি, কিন্তু গোড়ার গলদ দূর করছি না।
২. প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার ঝুঁকি: বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দেশের বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের সুবিধাগুলোর একটা বড় অংশই রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বজনপ্রীতির কারণে প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছায় না। নতুন কার্ড বিতরণ প্রক্রিয়ায় যদি এই কাঠামোগত দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাব দূর করা না যায়, তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর এই নতুন কার্ডও আরেকটি অকার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হবে।
৩. কর্মসংস্থান ও স্থায়ী সমাধানের অভাব: কার্ড বা ভাতা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তা দারিদ্র্য বিমোচনের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়। এই বিশাল বাজেট যদি উৎপাদনশীল খাত, যুবকদের কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যয় করা হতো, তবে মানুষ স্বাবলম্বী হতে পারত। মানুষকে কার্ডের ওপর নির্ভরশীল না করে,কর্মক্ষম করার উদ্যোগ নেওয়াটাই এই সংকটের সময়ে বেশি জরুরী ছিল।
৪. বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ ও বাজেটের বোঝা: দেশ যখন মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং রাজস্ব ঘাটতির মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ পার করছে, তখন নতুন একটি কার্ড প্রকল্পের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকার বড় অংকের বাজেট বরাদ্দ করা কতটা যৌক্তিক সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। যেখানে জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান খাতের বাজেট বাড়ানো প্রয়োজন, সেখানে কার্ডের পেছনে এই বিপুল ব্যয় বর্তমান বাজেটের ওপর চাপ আরও বাড়াবে।
তাই বাংলাদেশকে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের ক্ষণস্থায়ী বা লোকদেখানো প্রকল্পের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমাদের এই মুহূর্তে প্রয়োজন কার্ডের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করা।
লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক