স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে তৃণমূলে নতুন সমীকরণ

দলীয় প্রতীক ছাড়াই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। জনপ্রিয়তা, স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে প্রাধান্য দিয়ে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে থেকেই এলাকার উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যায় ভূমিকা রাখার মাধ্যমে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

সরকারি দলের পক্ষ থেকে স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় নেতৃত্বকে সামনে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বা দলীয় প্রতীক থাকছে না। তবে স্থানীয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থিত প্রার্থী থাকতে পারেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হওয়ার পর থেকেই তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে উৎসাহের পাশাপাশি এক ধরনের দায়বোধ তৈরি হয়েছে। অনেকে নিজ উদ্যোগে ভোটারদের খোঁজখবর নিচ্ছেন, এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে কাজ করছেন। এতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ছে।

তাঁর ভাষ্য, জনপ্রিয়তা অর্জন ও ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে নেতারা এলাকায় সময় দিচ্ছেন। স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন বিরোধ ও সমস্যা সমাধানেও তারা ভূমিকা রাখছেন। এর ফলে নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ ও জবাবদিহির একটি সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।

দলীয় প্রতীক না থাকায় এবার ভোটাররা প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় পর্যায়ে ভূমিকা বিবেচনার সুযোগ পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী থাকতে পারেন, তবে কাউকে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ থাকছে না।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। দলীয় প্রতীক না থাকলেও কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় স্থানীয়ভাবে মানুষের কাছে পরিচিত হতে পারে, তবে সেটি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার ওপর প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। জনপ্রিয়তা ও স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতাকে প্রার্থী নির্বাচনের অন্যতম বিবেচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে নেতাকর্মীদের যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব নিলে জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা বাড়বে। ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়ন, নাগরিক সমস্যা ও সেবার বিষয়ে জনগণের সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পর্কও জোরদার হবে।

ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। ১৪ সেপ্টেম্বর কমিশন জানিয়েছে, সারাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর। পরের ধাপগুলোর সম্ভাব্য তারিখ ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে।

প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে দেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। তবে ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ইসির ঘোষিত সম্ভাব্য তারিখ সম্পর্কে সরকার অবগত নয়। ফলে এসব তারিখকে এখনই চূড়ান্ত তফসিল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

দেশে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন। এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্থানীয় উন্নয়ন, নাগরিক সেবা ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন।

ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটাররা সরাসরি ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেন। অন্যদিকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোটে নির্বাচিত হন।

স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন আইনে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আইন অনুযায়ী, কমিশনের প্রণীত বিধি অনুসারে চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচন আয়োজন, পরিচালনা ও সম্পন্ন করার দায়িত্ব ইসির। নির্বাচনসংক্রান্ত আইন ও বিধিমালার তালিকাও নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রয়েছে।