আসক

দেশে সাত মাসে ধর্ষণের শিকার ৪০০ নারী, শিশু সহিংসতার ঘটনা ৬০৬

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৮ এএম

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে নারী ধর্ষণের ৪০০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩৭টি এবং ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ১৫২টি। এ ছাড়া শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ৬০৬টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৪১টি শিশু ধর্ষণ ও ২১৩টি শিশু হত্যার ঘটনা রয়েছে।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অংশীজন সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ‘নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার ও সেবা প্রদান জোরদারকরণ’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে সংগঠনটি।

সংলাপে সভাপতিত্ব করেন আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান। তিনি জানান, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে নারী ও কিশোরীদের যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের ১৯১টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

মানব পাচারের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তাহমিনা রহমান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানব পাচারসংক্রান্ত নতুন মামলা হয়েছে ১ হাজার ১২৬টি। আর চলতি বছরের মে পর্যন্ত বিচারাধীন ও তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৮৪টি।

সংলাপে উপস্থাপিত মূল নিবন্ধে জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত আইনগত সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ১৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯ জন উপকৃত হয়েছেন। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন ৩১ হাজার ২২২ জন। দেশের ৬৪টি জেলা আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন।

তবে দরিদ্র ও অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের জন্য আইনগত সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে জটিল ও সময়সাপেক্ষ বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়। একাধিক অনুমোদনের ধাপ, নিয়মিত সভা না হওয়া এবং আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের জটিলতায় সেবা পেতে বিলম্ব হচ্ছে। পাশাপাশি এসব প্রক্রিয়ায় যুক্ত অতিরিক্ত ব্যয়ও অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সংলাপে বক্তারা বলেন, নারী ও শিশু সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সেবা চালু থাকলেও এসব কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার অনেক মানুষ আইনগত সহায়তা ও সুরক্ষা সেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না জানায় প্রয়োজনের সময় সেবা নিতে পারেন না। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এবং সেবাগুলো সহজে পাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।

জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য দেশে ৯৫টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) ও সেল রয়েছে। তবে সব কেন্দ্রে চিকিৎসা, ফরেনসিক পরীক্ষা, আইনগত সহায়তা, মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসন—এই সেবাগুলো সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে সংলাপে জানানো হয়। অনেক কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টার সেবা, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক ল্যাব এবং পৃথক কাউন্সেলিংয়ের স্থানও পর্যাপ্ত নয়।

বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজমিন সুলতানা বলেন, নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার লঙ্ঘিত না হওয়াই প্রকৃত সুরক্ষা। তবে অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংলাপে জিএফএ কনসাল্টিং গ্রুপের নাগরিকতা, সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড প্রকল্পের ডেপুটি টিম লিডার ক্যাটরিনা কইনিগ, উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার লিজা বেগম, মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা আইভি আক্তার, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসির কোঅর্ডিনেটর ডা. তাইয়েবা সুলতানা এবং নারীপক্ষের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কামরুন্নাহারসহ সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য দেন।

আলোচনায় নারী, শিশু, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আইনগত ও সুরক্ষা সেবা আরও সহজলভ্য করা, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

এমইউ
আরও পড়ুন