বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের স্থবির সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিতে ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকায় সফর করেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। প্রায় ১৩ বছর পর কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর নানা উদ্যোগের ঘোষণা আসে। এর অন্যতম ছিল ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডর’।
এই উদ্যোগের আওতায় পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৫০০টি বৃত্তি দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। পাকিস্তানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিভিন্ন পাকিস্তানি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেছেন। ২০২৬ সালের ১০ মে ঢাকায় এই উদ্যোগের দ্বিতীয় ধাপও চালু করা হয়।
কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে আবেদন করা কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর অভিযোগ, ঘোষিত ‘ফুললি ফান্ডেড’ বৃত্তির সঙ্গে তাঁদের পাওয়া অফার লেটারের সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বলছেন, অফার লেটারে টিউশন ফি মওকুফ ও আবাসনের সুবিধা থাকলেও জীবনযাত্রার ভাতা, খাবার, যাতায়াত ও বিমান ভাড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ খরচের কথা নেই।
‘ফুললি ফান্ডেড’ থেকে শুধু টিউশন ও আবাসন?
নলেজ করিডরের প্রথম ব্যাচে প্রায় ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ধাপে ধাপে পাকিস্তানে যান এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যেও এই ৭৪ শিক্ষার্থীর পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষা শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এরপর গত মে মাসে ঢাকায় পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপোর মাধ্যমে নলেজ করিডরের দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম শুরু হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন পাকিস্তানি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তুলে ধরা হয় এবং ৫০০ বৃত্তির বিষয়ে প্রচার চালানো হয়।
অনেক শিক্ষার্থী আগের ঘোষণার ভিত্তিতেই ধরে নেন, দ্বিতীয় ধাপের বৃত্তিও হবে সম্পূর্ণ অর্থায়িত। আবেদন, পরীক্ষা ও বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর মাস্টার্স পর্যায়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী যখন অফার লেটার হাতে পান, তখনই তাঁদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অফার লেটারে ১০০ শতাংশ টিউশন ফি মওকুফ এবং আবাসনের সুবিধা থাকলেও মাসিক জীবনযাত্রার ভাতা নেই। খাবারের খরচ, স্থানীয় যাতায়াত, বিমান ভাড়া এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয়েরও উল্লেখ নেই।
কিছু শিক্ষার্থীর দাবি, ভিসা ফি, স্বাস্থ্যবীমা ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচও তাঁদের নিজেদের বহন করতে হবে। ফলে যে বৃত্তিকে শুরু থেকেই ‘ফুললি ফান্ডেড’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল, বাস্তবে তার আওতা কতটা তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, প্রতিশ্রুতি কোথায়?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষার্থী বলেন, সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও সংশ্লিষ্ট প্রচারে বৃত্তিটিকে সম্পূর্ণ অর্থায়িত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তাই আবেদন করার সময় শিক্ষার্থীরা ধরে নিয়েছিলেন, বিদেশে পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত প্রধান ব্যয়গুলো বৃত্তির আওতায় থাকবে।
ওই শিক্ষার্থীর ভাষ্য, মাস্টার্স পর্যায়ে যদি বৃত্তির আওতা টিউশন ফি ও আবাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আবেদন গ্রহণের সময়ই বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন ছিল।
আরেক শিক্ষার্থী জানান, তাঁর পাওয়া অফার লেটারে টিউশন ফি ও আবাসনের সুবিধা রয়েছে। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবহন, ভিসা ফি, চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যবীমা এবং অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, একই ধরনের শর্ত হয়তো মাস্টার্স পর্যায়ের অন্য আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
বৃত্তির সংজ্ঞা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি
এখানেই মূল প্রশ্নটি অর্থের পরিমাণ নয়, বরং বৃত্তির ঘোষিত ধরন ও বাস্তব সুবিধার মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু টিউশন ফি মওকুফ হলেই একজন শিক্ষার্থীর সব ব্যয় মিটে যায় না। থাকার ব্যবস্থা, খাবার, স্থানীয় যাতায়াত, ভিসা, স্বাস্থ্যবীমা, বিমান ভাড়া এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের ব্যয়ও একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাই কোনো বৃত্তিকে ‘ফুললি ফান্ডেড’ হিসেবে ঘোষণা করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই এমন প্রত্যাশা তৈরি হয় যে, এসব ব্যয়ের একটি বড় অংশ বা সম্পূর্ণটাই বৃত্তির আওতায় থাকবে। কিন্তু অফার লেটারে যদি তার প্রতিফলন না থাকে, তাহলে আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের আর্থিক পরিকল্পনা ও বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দুটিই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি মওকুফের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বৃত্তির প্রকৃত আর্থিক সুবিধা আবেদন করার আগেই স্পষ্টভাবে জানানো না হলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যায় পড়তে পারেন।
পাকিস্তানের ঘোষণায় কী বলা হয়েছিল?
২০২৫ সালের আগস্টে ইসহাক দারের ঢাকা সফরের সময় পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডরের ঘোষণা দেওয়া হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০০টি বৃত্তির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের সরকারি বিভিন্ন ঘোষণাতেও এই উদ্যোগকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দ্বিতীয় ধাপ চালুর সময় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃত্তিগুলোকে ‘fully funded scholarships’ হিসেবে উল্লেখ করে। একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীও সম্পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তির সুযোগের প্রশংসা করেন বলে পাকিস্তানের সরকারি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো নির্দিষ্ট অফার লেটারের আর্থিক শর্তগুলো এবং ওই ‘fully funded’ সংজ্ঞার মধ্যে কী কী ব্যয় অন্তর্ভুক্ত তা নিয়ে এখনই স্পষ্টতা প্রয়োজন বলে অভিযোগকারীরা মনে করছেন।
COMSATS-এর বৃত্তি নিয়েও ভিন্ন বাস্তবতা
এদিকে চলতি বছরের মার্চে পাকিস্তানের COMSATS University Islamabad (CUI) আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের বৃত্তির ঘোষণা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্যে OIC, SCO ও D-8 সদস্যদেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে বিভিন্ন বৃত্তির কথা বলা হয়েছে এবং আবেদনের শেষ সময় ছিল ৩১ মে ২০২৬।
তবে COMSATS-এর নিজস্ব ওয়েবসাইটে OIC/ICESCO/D-8/SCO-সংক্রান্ত বৃত্তির ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কিছু বৃত্তি শুধু ১০০ শতাংশ টিউশন ফি কভার করে। অর্থাৎ, সব ধরনের বৃত্তিকে একই অর্থে ‘সম্পূর্ণ অর্থায়িত’ হিসেবে দেখা যায় না।
এ কারণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোন বৃত্তি কোন পর্যায়ের, কারা পাচ্ছেন এবং ঠিক কোন কোন খরচ বৃত্তির আওতায় পড়ছে, তা আবেদন করার আগেই স্পষ্টভাবে জানানো।