যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের পদ্ধতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য, আদমশুমারি এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী আইন প্রয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও প্রকাশ করা হবে, তা নিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ বাড়ছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য জনস্বাস্থ্য, সরকারি সুবিধা বণ্টন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য তদন্ত এবং নীতি প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এলে তার প্রভাব সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গবেষণার ওপরও পড়তে পারে।
হাম-সংক্রান্ত মৃত্যুর তথ্য নিয়ে বিতর্ক
সাম্প্রতিক আলোচনার একটি বিষয় হলো হাম বা মিজলস-সংক্রান্ত তথ্য। রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা মন্ত্রী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) পরিচালককে পেনসিলভানিয়ায় হাম-সম্পর্কিত দুই মৃত্যুর উল্লেখ অনলাইন তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে পেনসিলভানিয়ার কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা সিডিসি গ্রহণ করেছিল যে ওই মৃত্যুগুলো হাম-সম্পর্কিত ছিল। বিষয়টি নিয়ে কেনেডি ও পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জোশ শাপিরোর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও হয়।
আদমশুমারি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য নিয়ে প্রশ্ন
ফেডারেল তথ্য ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো আদমশুমারি ব্যুরো। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, গত মাসে বাণিজ্য বিভাগ তাদের বৈজ্ঞানিক সততা-সংক্রান্ত নীতিমালা থেকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করার ভাষা বাদ দিয়েছে। বাণিজ্য বিভাগের অধীনেই আদমশুমারি ব্যুরো পরিচালিত হয়।
এই পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগের কারণ হলো, সরকারি পরিসংখ্যান তৈরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণকে আলাদা রাখার নীতিকে বৈজ্ঞানিক সততার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের তথ্যও প্রশ্নে
কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, সমান কর্মসংস্থান সুযোগ কমিশন এমন কিছু তথ্য সংগ্রহ বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে, যা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ তদন্তে সংস্থাটিকে সহায়তা করেছে।
এসব তথ্যের মধ্যে কর্মীদের জাতিগত ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যসংক্রান্ত পরিসংখ্যান রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের ধরন শনাক্ত এবং অভিযোগ তদন্তে এসব তথ্য ব্যবহার করা হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি তথ্য?
কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য শুধু সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পরিসংখ্যান নয়। জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা, সরকারি সহায়তা বণ্টন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য তদন্ত, গবেষণা এবং নীতি প্রণয়নে এসব তথ্য ব্যবহৃত হয়।
তাই কোন তথ্য সংগ্রহ করা হবে, কোনটি প্রকাশ করা হবে এবং তথ্যের সংজ্ঞা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে—এসব সিদ্ধান্ত সরকারি নীতিনির্ধারণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
সাবেক মার্কিন প্রধান তথ্যবিজ্ঞানী ডেনিস রস অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, বর্তমান প্রশাসনে তথ্য ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাবের মাত্রা তাঁর ২৫ বছরের কর্মজীবনে দেখা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বলে তিনি মনে করেন। এটি তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন; প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়নি।
তথ্য ব্যবস্থাকে তিনি সরকারের একটি ‘অদৃশ্য অবকাঠামো’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, স্বাভাবিক সময়ে এর গুরুত্ব খুব বেশি চোখে পড়ে না, কিন্তু তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নষ্ট হলে তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্য
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন সরকারি তথ্যকে রাজনৈতিকভাবে পরিচালনা করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই বলেছেন, প্রশাসন জনগণকে সময়োপযোগী, নির্ভুল ও প্রাসঙ্গিক তথ্য দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসব তথ্য গবেষণা, জনআলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
সামনে কী হতে পারে?
কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থাগুলো তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের নিয়ম পরিবর্তন করলে এর প্রভাব শুধু সরকারি দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। গবেষক, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষও সরকারি পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করেন।
তাই ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে ঘিরে মূল বিতর্ক হচ্ছে—সরকারি তথ্য ব্যবস্থায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে এবং বৈজ্ঞানিক ও পরিসংখ্যানগত তথ্যের নিরপেক্ষতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্যের পাশাপাশি সমালোচকদের উদ্বেগও সামনে এসেছে।
সূত্র: অ্যাক্সিওস
ইরান যুদ্ধ নিয়ে উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প
পর্দার আড়ালে এক টেবিলে ইসরায়েল ও আরব দেশগুলো: মধ্যপ্রাচ্যে কার স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে?
ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও আরব সামরিক প্রধানদের গোপন বৈঠক
হুথিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন বৈঠক, যেসব সিদ্ধান্ত আসলো
হুথির চাপে সৌদি, কোথায় 'বন্ধু' পাকিস্তান-তুরস্ক?