ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি বেড়েছে ৯৩ শতাংশ, মৃত্যু ৫০ শতাংশ

বাংলাদেশে চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক রূপ নিয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮০ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৪৫৮ জন। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৬ হাজার ৫১৪ এবং মৃতের সংখ্যা ছিল ৩০৭।

দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাসে চলতি বছরের হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০০০ সালে ডেঙ্গুর তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর কেবল ২০২৩ সালে এর চেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আর মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে চলতি বছর তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭০৫ জন এবং ২০২৪ সালে ৫৭৫ জন ডেঙ্গুতে মারা যান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে নতুন করে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬৭৪ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৫ হাজার ৮২৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ১৪৮ জন। সে সময় পর্যন্ত এটিই ছিল বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস। তবে অক্টোবরে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৪ জনে, যা চলতি বছরের এক মাসে সর্বোচ্চ প্রাণহানির রেকর্ড। এরপর নভেম্বরের প্রথম সাত দিনেই মারা গেছেন আরও ৩৫ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মহামারি-সংক্রান্ত বুলেটিনেও বাংলাদেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতির চিত্র বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, বছরজুড়ে বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর মশকনিধন কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণেই দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হচ্ছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান কীটতত্ত্ববিদ তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনগুলো বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘টুকরো টুকরো বা দায়সারা ব্যবস্থা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানান, মশকনিধন কার্যক্রমে নগরবাসীকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তিনি বলেন, ‘জনসচেতনতা এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’ অন্যদিকে, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত লার্ভিসাইড স্প্রে ও ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

এদিকে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ডেঙ্গু শনাক্তে বিলম্ব এবং দেরিতে হাসপাতালে ভর্তির প্রবণতা রোগীদের জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকিরের নেতৃত্বে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় ১১৯ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, মারা যাওয়া রোগীদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হাসপাতালে ভর্তির মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মারা গেছেন।

পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, মোট মৃত্যুর ৬২ দশমিক ৫ শতাংশের কারণ ছিল ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’। আর ৩১ দশমিক ২ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল ‘এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম’। এ ছাড়া চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়াই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় পৌঁছানোর কারণে অনেক রোগী হাসপাতালে আসার আগেই অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রথম বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সালে। সে বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মারা গিয়েছিলেন ৯৩ জন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। পরবর্তী বছর ২০২৫ সালে বছরজুড়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ এবং মোট মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের।