সাগরের ৬২ হাজার ৭৫৮ বর্গকিলোমিটারের বেশি তলদেশের মানচিত্র তৈরি করলো সৌদি

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১৬ পিএম

লোহিত সাগরের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও গবেষণা জোরদারে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির সাম্প্রতিক গবেষণায় সাগরের ৬২ হাজার ৭৫৮ বর্গকিলোমিটারের বেশি তলদেশের মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন সামুদ্রিক প্রজাতি শনাক্ত এবং ২০টির বেশি ‘ব্লু হোল’ বা গভীর সামুদ্রিক গর্ত আবিষ্কারের তথ্যও উঠে এসেছে।

রোববার (৮ নভেম্বর) সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) বরাতে আরব নিউজ জানায়, এসব গবেষণা ও তথ্যের ভিত্তিতে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে দেশটি। ২০৩০ সালের মধ্যে লোহিত সাগরের সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকার পরিমাণ বর্তমান ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের লোহিত সাগর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি সমুদ্র অনুসন্ধান, জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। গবেষণার লক্ষ্য এখন শুধু সামুদ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ নয়, বরং বাস্তুতন্ত্র ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন।

সমুদ্রের তলদেশে বিস্তৃত গবেষণা

সৌদি আরবের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ওয়াইল্ডলাইফ (এনসিডব্লিউ), কিং আবদুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (কাউস্ট) এবং ওশানএক্সের যৌথ গবেষণায় লোহিত সাগরের তলদেশের উচ্চ রেজল্যুশনের মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। ২০২২ সালের ‘ডিকেড এক্সপেডিশন’-এর তথ্য ব্যবহার করে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আর্থ সিস্টেম সায়েন্স ডেটা সাময়িকীতে।

গবেষণায় সৌদি উপকূলের ৮৬০ কিলোমিটার এলাকায় সমুদ্রের তলদেশ জরিপ করা হয়। এতে ২ মিটার থেকে ২ হাজার ৪৬০ মিটারের বেশি গভীরতার তথ্য উঠে এসেছে।

ডিকেড এক্সপেডিশনের ১৯ সপ্তাহের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে ৬২ হাজার ৭৫৮ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রতল মানচিত্রায়ন করা হয়। সংগ্রহ করা হয় ২ হাজার ৮০০টির বেশি জীববৈজ্ঞানিক ও জিনগত নমুনা। এ ছাড়া চালানো হয় ৪৪টি মনুষ্যচালিত গভীর সমুদ্র অভিযান এবং স্বয়ংক্রিয় যান দিয়ে ১৩৩টি অভিযান।

গবেষকেরা আগে অজানা চারটি প্রবাল প্রজাতিও শনাক্ত করেছেন। কাউস্টের বিজ্ঞানী মাইকেল বেরুমেনের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় নতুন কিছু স্থানীয় বা নির্দিষ্ট অঞ্চলে পাওয়া যায় এমন সামুদ্রিক প্রজাতির অস্তিত্বের তথ্য উঠে এসেছে।

২০টির বেশি ব্লু হোল সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা

লোহিত সাগরের দক্ষিণ উপকূলে ২০টির বেশি ব্লু হোল আবিষ্কারের তথ্য জানিয়েছেন এনসিডব্লিউর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ কুরবান। এসব বিরল ভূতাত্ত্বিক গঠনে প্রবাল, স্পঞ্জ, সামুদ্রিক কচ্ছপ ও বিভিন্ন মাছের আবাসস্থল রয়েছে।

৪৭ থেকে ৫১ দশমিক ৫ মিটার গভীরতার এসব স্থানের জরিপের পর ২০২৫ সালে সৌদি মন্ত্রিসভা ব্লু হোল এলাকাকে জাতীয় সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে।

এদিকে, লোহিত সাগরের প্রবালপ্রাচীর ও কচ্ছপ সংরক্ষণে কাজ করছে জেনারেল অর্গানাইজেশন ফর কনজারভেশন অব কোরাল রিফস অ্যান্ড টার্টলস ইন দ্য রেড সি (শামস)। সংস্থাটি উপকূলের ১ হাজার স্থানে পাঁচ বছর মেয়াদি পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষ নাগাদ ৩৪৪টি স্থানে কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

শামসের গবেষণায় এখন পর্যন্ত ২৫১ প্রজাতির প্রবাল শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি স্থানীয় বা এ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ এবং ৫৪টি বিপন্ন প্রজাতি। এ ছাড়া ৩৫৮ প্রজাতির প্রবালপ্রাচীরের মাছের সন্ধান পাওয়া গেছে।

সংস্থাটি ৩২১টি প্রবাল বিবর্ণতা জরিপ করেছে, ৭২টি স্থানের পরিবেশগত ধারণক্ষমতা মূল্যায়ন করেছে এবং পাঁচ মিটারের বেশি ব্যাসের ৪৬টি বিশাল প্রবাল কলোনি শনাক্ত করেছে। তাদের প্রবাল নার্সারিতে বর্তমানে ১৩টি গণের ৩৮০টি প্রবাল কলোনি রয়েছে। এর মধ্যে ১৯২টি পুনরায় প্রবালপ্রাচীর তৈরির প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত।

সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণেও অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৫ সালে সৌদি জলসীমার ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত এলাকায় ৬৩৮টি কচ্ছপের বাসা শনাক্ত করা হয়। এসব এলাকায় দেশটির মোট কচ্ছপের ডিম পাড়ার প্রায় ৭০ শতাংশ কার্যক্রম ঘটে। ২০২৪ সালে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম বিশেষায়িত সামুদ্রিক কচ্ছপ পুনর্বাসন কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করে শামস।

বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রবালপ্রাচীর

লোহিত সাগরে রয়েছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রবালপ্রাচীর ব্যবস্থা। বিশ্বের মোট প্রবালপ্রাচীরের প্রায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ এ সাগরে অবস্থিত। এখানে ৩১০টির বেশি ধরনের প্রবাল রয়েছে, যার মধ্যে ২৭০টি শক্ত প্রবাল প্রজাতি।

বিজ্ঞানীদের কাছে এ অঞ্চলের প্রবালপ্রাচীর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তুলনামূলক বেশি সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা সহ্য করার সক্ষমতা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

ভিশন ২০৩০ ও নীল অর্থনীতির লক্ষ্য

সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির আওতায় অর্থনীতির বহুমুখীকরণে সামুদ্রিক গবেষণার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মাছ চাষ, টেকসই মৎস্য আহরণ, উপকূলীয় উন্নয়ন এবং ওষুধ গবেষণায় এসব তথ্য ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রবালপ্রাচীরের ছবি বিশ্লেষণ ও সামুদ্রিক প্রজাতি শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘রিফনেটএআই’ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে দেশটি। পাশাপাশি সামুদ্রিক রোবট, দূর অনুধাবন ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান ব্যবহারের পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে।

গবেষণার তথ্য ব্যবহার করে সংবেদনশীল সামুদ্রিক আবাসস্থল, সংরক্ষণ এলাকা এবং পর্যটন ও বাণিজ্যিক উন্নয়নের উপযোগী অঞ্চল চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি সামুদ্রিক পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।

এনসিডব্লিউর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. কুরবানের মতে, এসব তথ্যনির্ভর উদ্যোগ সৌদি আরবের জাতীয় লোহিত সাগর টেকসই উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়নে সহায়তা করছে। দেশটির লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকার পরিমাণ ৩০ শতাংশে উন্নীত করা।

গবেষণা, প্রযুক্তি ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের সমন্বয়ে লোহিত সাগরকে সামুদ্রিক বিজ্ঞান, পরিবেশ উদ্ভাবন এবং ‘ব্লু ইকোনমি’র বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করতে চায় সৌদি আরব।

এমএজেড
আরও পড়ুন