আর মাত্র কিছুদিন পরই পবিত্র মাহে রমজান। মুসলমানদের জীবনে রমজান শুধু একটি উপবাসের মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম, সহমর্মিতা ও নৈতিক পুনর্জাগরণের অনন্য সময়। কিন্তু বাস্তবতা হলো- রমজান এলেই আমাদের প্রস্তুতি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে খাবারের তালিকা, বাজারদর, ইফতার সামগ্রী কিংবা তারাবির সময়সূচিতে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি রমজানের প্রকৃত প্রস্তুতি নিচ্ছি? ইবাদতের পাশাপাশি যে নৈতিক ও সামাজিক শুদ্ধতার ডাক রমজান দেয়, তার জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত?
রমজান ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি- রোজা পালনের মাস। কিন্তু রোজা কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়। কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রোজার উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন- অর্থাৎ আল্লাহভীতি ও আত্মসংযম। এই তাকওয়া ব্যক্তির চরিত্র, আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধে প্রতিফলিত হওয়ার কথা।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, রমজানে মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু সমাজে দুর্নীতি, অসততা, মিথ্যাচার ও ভোগবাদ কমে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়- রমজান এলেই পণ্যের দাম বাড়ে, মজুতদারি বৃদ্ধি পায়, ভেজাল ও প্রতারণা আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। এই দ্বন্দ্ব আমাদের আত্মসমালোচনার মুখে দাঁড় করায়।
রমজানের প্রস্তুতি শুরু হওয়া উচিত আত্মসমালোচনা দিয়ে। আমি কেমন মানুষ? আমার উপার্জন কি হালাল? আমি কি অন্যের অধিকার নষ্ট করছি? আমার কথাবার্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তে কি ন্যায় ও মানবিকতার প্রতিফলন আছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই রমজানের প্রকৃত প্রস্তুতি।
রোজা রেখে যদি আমরা মিথ্যা বলি, অন্যায় করি, দুর্নীতিতে জড়াই কিংবা কাউকে কষ্ট দিই- তাহলে সেই রোজা আমাদের কী দিল? হাদিসে এসেছে, অনেক রোজাদার আছে, যাদের রোজা কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণাই বাড়ায়। অর্থাৎ নৈতিক পরিশুদ্ধতা ছাড়া ইবাদত অর্থহীন হয়ে পড়ে।
রমজান ব্যক্তি জীবনের পাশাপাশি সমাজ জীবনেরও শুদ্ধতার আহ্বান জানায়। ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। তাই রমজানের প্রস্তুতিও হতে হবে সামাজিকভাবে।
সমাজে যদি বৈষম্য চরমে থাকে, দরিদ্র মানুষ যদি অনাহারে থাকে, শ্রমিক যদি ন্যায্য মজুরি না পায়, নারী ও শিশু যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে- তাহলে আমাদের ইবাদত সমাজকে কতটা বদলাতে পারছে, সেই প্রশ্ন উঠে আসে।
রমজান আমাদের শেখায়- ক্ষুধার কষ্ট কী, বঞ্চনার যন্ত্রণা কেমন। এই শিক্ষা যদি সমাজে সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজে না লাগে, তবে রমজানের মূল বার্তাই অপূর্ণ থেকে যায়।
প্রতিবছর রমজান এলেই বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়, অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে।
এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর নৈতিক সংকট। একজন মুসলমান ব্যবসায়ীর কাছে রমজান হওয়ার কথা ছিল সর্বোচ্চ সততার মাস। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই এই মাসকেই বেছে নেয় সর্বোচ্চ লাভের জন্য। এই দ্বিচারিতা রমজানের শিক্ষা ও সমাজের বাস্তবতার মধ্যে ভয়াবহ ফাঁক তৈরি করেছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে অস্বীকার করা যায় না। বাজার মনিটরিং, মজুতদারি রোধ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা- এসব শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়; এগুলো রমজানের সামাজিক মর্যাদা রক্ষার অংশ।
রমজান শুধু ব্যক্তি বা পরিবারকেন্দ্রিক প্রস্তুতির বিষয় নয়; রাষ্ট্র ও সমাজকেও প্রস্তুত হতে হয়। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যনিরাপত্তা, ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ, শ্রমজীবীদের সুরক্ষা- এসব নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
একই সঙ্গে সমাজের বিত্তবান শ্রেণিরও দায়িত্ব আছে। যাকাত, ফিতরা ও দান যেন লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকৃত দরিদ্র, কর্মহীন ও অসহায় মানুষের কাছে এই সহায়তা পৌঁছানোই রমজানের শিক্ষা।
তরুণ প্রজন্ম আজ এক সংকটকাল অতিক্রম করছে- বেকারত্ব, হতাশা, মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব। রমজান তাদের জন্য হতে পারে নৈতিক পুনর্গঠনের সুযোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো- আমরা কি তরুণদের কাছে রমজানকে কেবল রোজা রাখা ও নামাজ পড়ার মাস হিসেবে উপস্থাপন করছি, নাকি ন্যায়, সততা ও দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার আদর্শ হিসেবে?
পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো- রমজানের প্রকৃত দর্শন তরুণদের সামনে তুলে ধরা। যাতে তারা বোঝে, ধর্ম মানে কেবল আচার নয়; এটি চরিত্র গঠনের নাম।
রমজানে মসজিদ হয়ে ওঠে মানুষের মিলনকেন্দ্র। ইমাম, খতিব ও আলেম সমাজের বক্তব্য তাই সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। এই সময়ে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের কথা নয়, সামাজিক ন্যায়বিচার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, মানবিক মূল্যবোধের কথাও জোরালোভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। ধর্ম যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলে, তবে তা সমাজ বদলের শক্তি হারায়। রমজান সেই সুযোগ এনে দেয়- নৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সমাজকে সঠিক পথে আহ্বান জানানোর।
রমজানের শিক্ষা রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ক্ষমতাসীনদের জন্য রমজান হওয়া উচিত আত্মসমালোচনার মাস- আমি কি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছি? আমি কি জনগণের অধিকার রক্ষা করেছি? বিরোধী মতকে দমন করেছি কি না?
যদি রমজানের শিক্ষা রাজনীতিতে প্রতিফলিত না হয়, তবে সমাজে নৈতিক দ্বিচারিতা আরও গভীর হয়। ধর্ম তখন বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, শুদ্ধতার অনুপ্রেরণা নয়।
রমজান আমাদের সামনে এক অনন্য সুযোগ নিয়ে আসে- নিজেকে, পরিবারকে, সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ। এই প্রস্তুতি যদি কেবল রান্নাঘর, বাজার আর ইবাদতের সময়সূচিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে রমজান শেষ হলে আমরা আগের জায়গাতেই ফিরে যাব। কিন্তু যদি ইবাদতের আগে নৈতিক ও সামাজিক শুদ্ধতার প্রস্তুতি নিই- তাহলে রমজান হয়ে উঠতে পারে ব্যক্তিগত ও জাতীয় পুনর্জাগরণের সূচনা। রমজান হোক কেবল উপবাসের মাস নয়, বরং অন্যায়, অসততা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিবাদের মাস। ইবাদতের সঙ্গে নৈতিকতা, সংযমের সঙ্গে সহমর্মিতা- এই সমন্বয়েই রমজানের প্রকৃত সার্থকতা।
লেখক: উপপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
bbqif1983@gmail.com