সময় কখনো থেমে থাকে না- তবু কখনো কখনো মনে হয়, সময় যেন হঠাৎ করে দৌড়ের গতি বদলে ফেলেছে। এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও মূল্যবোধের সঙ্গে পরের প্রজন্মের ভাবনার দূরত্ব এখন আর কেবল বয়সের ব্যবধান নয়; এটি প্রযুক্তি, জ্ঞান ও জীবনদর্শনের এক গভীর ফারাক। আশির দশকের শৈশব, নব্বইয়ের দুরন্ত কৈশোর, দুই হাজারের শুরুর প্রযুক্তি-উন্মুখ যৌবন আর আজকের জেনজি ও আলফা প্রজন্ম- সব মিলিয়ে মানবসভ্যতা যেন একসঙ্গে বহু যুগে বাস করছে।
একসময় শৈশব মানে ছিল উঠোন, মাঠ, গাছ, পুকুর আর বিকেলের রোদ। গল্প হতো মুখে মুখে, কল্পনা তৈরি হতো চোখে দেখা বাস্তবতা থেকে। ভাই-বোন, চাচাতো-মামাতো আত্মীয়দের সঙ্গে ঝগড়া, খুনসুটি, মারামারি আর আবার মিল- এসবের মধ্যেই গড়ে উঠত সম্পর্কের শক্ত ভিত। তখন খেলনা ছিল কাঠের, গল্প ছিল মানুষের, আর শেখার জায়গা ছিল জীবন নিজেই। সেই সময়ের শিশুরা প্রযুক্তি জানত না- কিন্তু মানুষ চিনত।
আজকের শিশুরা জন্মের পর থেকেই স্ক্রিন দেখে বড় হচ্ছে। মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ- এগুলো তাদের কাছে খেলনা নয়, বরং স্বাভাবিক বাস্তবতা। তারা গল্প শোনে ইউটিউব থেকে, বন্ধু পায় অনলাইনে, আর কল্পনার জগৎ গড়ে ওঠে ভার্চুয়াল পরিসরে। এখানে প্রশ্ন ওঠে- এই পরিবর্তন কি শুধু স্বাভাবিক বিবর্তন, নাকি আমরা অজান্তেই এক নতুন ধরনের মানবিক সংকটে প্রবেশ করছি?
প্রজন্মের এই পরিবর্তন বোঝার জন্য আমাদের ফিরে তাকাতে হয় ইতিহাসের দিকে। শিল্পবিপ্লব মানুষকে যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, বিদ্যুৎ বিপ্লব রাতকে দিনে পরিণত করেছিল, তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব পৃথিবীকে করেছে সংযুক্ত। আর এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, বিগ ডেটা, ইন্টারনেট অব থিংস- মানুষের চিন্তা, কাজ ও সিদ্ধান্তের জায়গাতেই হস্তক্ষেপ করছে। প্রযুক্তি আর কেবল সহায়ক নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি সিদ্ধান্তদাতা।
এই প্রেক্ষাপটে জেনজি ও আলফা প্রজন্মকে বোঝা সহজ নয়। তারা দ্রুত শেখে, দ্রুত ভুলে যায়, এবং দ্রুত বদলে যায়। তাদের ধৈর্য কম, কিন্তু অভিযোজন ক্ষমতা প্রবল। তারা প্রশ্ন করে, কর্তৃত্ব মানে না, এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। আগের প্রজন্ম যেখানে নিয়মের ভেতর দিয়ে নিরাপত্তা খুঁজত, নতুন প্রজন্ম সেখানে স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে অর্থ খোঁজে। এই পার্থক্য অনেক সময় প্রজন্মগত সংঘাত তৈরি করে।
তবে এই সংঘাতের দায় কি শুধু নতুন প্রজন্মের? নাকি আমাদেরই বোঝার ঘাটতি আছে? আমরা অনেক সময় পুরোনো মানদণ্ড দিয়ে নতুন বাস্তবতাকে বিচার করতে চাই। অথচ বাস্তবতা বদলে গেছে। আজকের পৃথিবীতে একটি ফোন মানে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি জ্ঞান, বিনোদন, কর্মসংস্থান, রাজনীতি, এমনকি পরিচয়ের অংশ। একটি ক্লিকেই তথ্য পাওয়া যায়- যা একসময় বইয়ের তাক খুঁজেও পাওয়া যেত না।
কিন্তু এই সহজলভ্যতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিপদ। অতিরিক্ত তথ্য মানুষকে জ্ঞানী না করে অনেক সময় বিভ্রান্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পর্ক তৈরি করছে ঠিকই, কিন্তু সেই সম্পর্ক কতটা গভীর? আমরা হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত, অথচ একা। মুখোমুখি কথোপকথনের জায়গা দখল করেছে ইমোজি, অনুভূতির জায়গায় এসেছে রিঅ্যাকশন। মানবিক স্পর্শ কমছে, বাড়ছে যান্ত্রিক যোগাযোগ।
শিক্ষাব্যবস্থাও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। আগে শিক্ষা মানে ছিল মুখস্থ, এখন শিক্ষা মানে দক্ষতা। আগে শিক্ষক ছিলেন জ্ঞানের একমাত্র উৎস, এখন শিক্ষক কেবল গাইড। শিক্ষার্থী চাইলে গুগল, ইউটিউব কিংবা এআইয়ের কাছে প্রশ্ন করতে পারে। এতে একদিকে যেমন শেখার সুযোগ বেড়েছে, অন্যদিকে তেমনি গভীর চিন্তা ও মনোযোগের অভ্যাস কমছে। দ্রুত ফলাফল চাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি সাধনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
কর্মজগতেও প্রজন্মগত ফারাক স্পষ্ট। আগের প্রজন্ম স্থায়িত্ব খুঁজত- একটি চাকরি, একটি পেনশন, একটি নির্দিষ্ট জীবনপথ। নতুন প্রজন্ম খোঁজে অর্থ ও উদ্দেশ্যের সমন্বয়। তারা ফ্রিল্যান্সিং করে, স্টার্টআপ গড়ে, একাধিক পরিচয়ে বাঁচে। তারা কাজকে জীবনের কেন্দ্র বানাতে চায় না; বরং জীবনকে কাজের কেন্দ্র বানাতে চায়। এতে প্রবীণদের চোখে তারা দায়িত্বহীন মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তারা ভিন্ন ধরনের দায়িত্ব নিচ্ছে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আমাদের সামনে নৈতিক প্রশ্নও তুলে ধরছে। এআই যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে দায় কার? রোবট যদি কাজ করে, মানুষ করবে কী? প্রযুক্তি যদি নিয়ন্ত্রণ নেয়, মানবিকতা থাকবে কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। প্রযুক্তি যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অসমতাও বাড়াচ্ছে। যারা প্রযুক্তি জানে, তারা এগিয়ে যাচ্ছে; যারা জানে না, তারা পিছিয়ে পড়ছে। এই ডিজিটাল বৈষম্য ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। একদিকে তরুণ জনগোষ্ঠীর বিশাল সম্ভাবনা, অন্যদিকে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে সমান প্রবেশাধিকারের অভাব। যদি আমরা এই তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে দেখি, তাহলে তাদের সৃজনশীল শক্তি নষ্ট হবে। বরং তাদের উদ্ভাবক, চিন্তক ও পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
এখানেই আসে প্রজন্মের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজন। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও নতুনদের উদ্ভাবনী শক্তির মধ্যে সেতুবন্ধন না হলে সমাজ এগোবে না। নতুন প্রজন্মকে শুধু ‘মোবাইলে আসক্ত’ বলে দায় সেরে ফেললে হবে না; তাদের বাস্তবতা বুঝতে হবে। আবার নতুনদেরও বুঝতে হবে- সব পুরোনো মূল্যবোধ অচল নয়। সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা- এসব কোনো অ্যাপ দিয়ে ডাউনলোড করা যায় না।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র- তিন ক্ষেত্রেই এই বোঝাপড়া জরুরি। পরিবারে সময় দিতে হবে, গল্প বলতে হবে, শুনতে হবে। সমাজে তৈরি করতে হবে এমন পরিসর, যেখানে প্রযুক্তি থাকবে কিন্তু মানুষ হারাবে না। রাষ্ট্রকে বিনিয়োগ করতে হবে মানবিক প্রযুক্তিতে- যেখানে উন্নয়ন মানে কেবল জিডিপি নয়, বরং মানসিক ও সামাজিক সুস্থতাও।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা প্রযুক্তির নয়, প্রশ্নটা মানুষের। প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় পৃথিবী দিয়েছে- কিন্তু সেই মুঠো যদি হৃদয়শূন্য হয়, তাহলে পৃথিবীও শূন্য হয়ে যাবে। প্রজন্ম বদলাবে, সময় এগোবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভাবনার সেতু গড়তে পারি, তাহলে এই পরিবর্তন হবে আশীর্বাদ, অভিশাপ নয়।
সময় থমকে নেই- কিন্তু আমরা চাইলে সময়ের সঙ্গে হাঁটতে পারি। নতুন প্রযুক্তিকে ভয় নয়, বুদ্ধি দিয়ে গ্রহণ করতে পারি। নতুন প্রজন্মকে অবিশ্বাস নয়, দিকনির্দেশ দিতে পারি। তাহলেই হয়তো একদিন দেখা যাবে- মুঠোয় ধরা পৃথিবীর মাঝেও মানুষ হারিয়ে যায়নি, বরং নতুনভাবে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে।
লেখক: কবি, গল্পকার ও গণসংযোগবিদ

