ঘৃণা কখনোই জ্ঞানের মাধ্যমে ছড়ায় না। ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে অজ্ঞতার মাধ্যমে। ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য- সবখানেই আমরা বারবার এই নির্মম সত্যের সাক্ষী হয়েছি। অজ্ঞতা যখন বিশ্বাসের জায়গা দখল করে নেয়, তখন মানুষ যুক্তির বদলে আবেগে, প্রমাণের বদলে গুজবে, আর সত্যের বদলে অপপ্রচারে পরিচালিত হয়। ফলাফল- সহিংসতা, বিভাজন, রক্তপাত।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা এমন বহু ঘটনার সন্ধান পাই, যেখানে হত্যাকারীর হাতে অস্ত্র ছিল, কিন্তু মাথায় ছিল না জ্ঞানের আলো। যেমন সাবেক মিশরীয় রাষ্ট্রপতি Anwar Sadat-এর হত্যাকাণ্ড। আদালতে বিচারক যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সাদাতকে কেন হত্যা করেছ?’ -খুনির উত্তর ছিল, ‘কারণ সে সেক্যুলার ছিল।’ পরবর্তী প্রশ্ন- ‘সেক্যুলার মানে কী?’ -এর জবাবে সে বলেছিল, ‘আমি জানি না।’
অর্থাৎ, যে শব্দের অর্থই সে জানে না, সেই শব্দের ভিত্তিতেই সে একজন রাষ্ট্রনেতাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে!
একইভাবে, নোবেলজয়ী মিশরীয় সাহিত্যিক Naguib Mahfouz-এর ওপর হামলার ঘটনাও ছিল অজ্ঞতার নির্মম উদাহরণ। তার উপন্যাস Children of Gebelawi-কে ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। বিচারক জানতে চান- ‘তুমি কি বইটি পড়েছ?’ হামলাকারীর জবাব- ‘না।’
অর্থাৎ, না পড়ে, না বুঝে, অন্যের কথায় বিশ্বাস করে একজন লেখকের জীবননাশের চেষ্টা!
আরেক মর্মান্তিক ঘটনা- মিশরীয় চিন্তাবিদ Farag Foda-এর হত্যাকাণ্ড। তাকে হত্যা করার কারণ জানতে চাইলে খুনি বলেছিল, ‘তার ঈমান নাই।’
প্রশ্ন করা হলো- ‘কোন বই পড়ে বুঝলে?’
উত্তর- ‘আমি বই পড়িনি। আমি লিখতে-পড়তে জানি না।’
এ যেন এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি- অজ্ঞতার হাতে জ্ঞানের ওপর আঘাত।
অজ্ঞতা শুধু শিক্ষার অভাব নয়; অজ্ঞতা হলো চিন্তার অনুশীলনের অভাব। আমরা অনেক সময় ডিগ্রি অর্জন করি, কিন্তু মননশীলতা অর্জন করি না। তথ্য জানি, কিন্তু বিশ্লেষণ করতে শিখি না। ফলে গুজব আমাদের কাছে সত্যের মতো মনে হয়, উসকানি হয়ে ওঠে নীতির মতো দৃঢ়।
সমাজে যখন মুক্তচিন্তার পরিবেশ সংকুচিত হয়, প্রশ্ন করার সাহস কমে যায়, মতের ভিন্নতাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়—তখন অজ্ঞতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তখন ঘৃণা সংগঠিত হয়, যুক্তি নির্বাসিত হয়।
ঘৃণা কখনো স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্মায় না; তাকে লালন-পালন করা হয়। ইতিহাসে দেখা যায়, রাজনৈতিক স্বার্থে, ক্ষমতার লোভে, অথবা মতাদর্শিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে বিভক্ত করা হয়েছে। ‘ওরা’ আর ‘আমরা’ এই বিভাজন রেখা টানার মধ্য দিয়েই ঘৃণার বীজ বপন করা হয়।
একটি সমাজে যদি শিক্ষা-সংস্কৃতি দুর্বল হয়, পাঠাভ্যাস কমে যায়, গবেষণা ও সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা না থাকে- তাহলে সেখানে গুজব দ্রুত ছড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তো এটি আরও ভয়াবহ। একটি ভুয়া পোস্ট, একটি বিকৃত ভিডিও, একটি অপপ্রচার মুহূর্তেই মানুষের মনে সন্দেহ, ক্রোধ ও ঘৃণা তৈরি করতে পারে।
জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে। কারণ জ্ঞানী ব্যক্তি জানেন- তিনি সব জানেন না। তিনি প্রশ্ন করেন, খোঁজ নেন, প্রমাণ যাচাই করেন। তিনি শোনেন, তারপর মত দেন।
অন্যদিকে অজ্ঞ ব্যক্তি আগে মত দেন, পরে প্রমাণ খোঁজেন- তা-ও যদি খোঁজেন।
জ্ঞান মানুষকে সহনশীল করে। কারণ জ্ঞান মানুষকে শেখায় পৃথিবী বহুমাত্রিক। মতের ভিন্নতা স্বাভাবিক। চিন্তার পার্থক্য মানেই শত্রুতা নয়।
আমাদের সমাজেও আমরা প্রায়ই দেখি- কেউ একটি বই না পড়েই সেটিকে ‘অশ্লীল’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ বলে আখ্যা দেয়। কেউ একটি বক্তব্যের পুরো প্রেক্ষাপট না জেনেই তাকে “রাষ্ট্রবিরোধী” বলে ঘোষণা করে।
ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ক্লিপ, টুকরো বক্তব্য- এসবের ওপর ভিত্তি করে আমরা মানুষকে বিচার করি। অথচ সত্য জানার জন্য সময় দিই না।
একজন লেখক হিসেবে, একজন গণসংযোগবিদ হিসেবে আমি দেখেছি- গুজবের চেয়ে দ্রুত কিছু ছড়ায় না। কিন্তু সত্য প্রতিষ্ঠা করতে সময় লাগে, পরিশ্রম লাগে, ধৈর্য লাগে। তাই যারা ঘৃণা ছড়াতে চায়, তারা অজ্ঞতার পথ বেছে নেয়- কারণ সেটি সহজ।
কারো বিরুদ্ধে নেতিবাচক মন্তব্য করার আগে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত-
‘আমি কি বিষয়টি প্রমাণসহকারে জানি?’
‘আমি কি মূল উৎসটি পড়েছি?’
‘আমি কি বিপরীত মতটিও শুনেছি?’
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে আমাদের নীরব থাকা উত্তম। কারণ অর্ধসত্য অনেক সময় পূর্ণ মিথ্যার চেয়েও বিপজ্জনক।
শুধু আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, প্রয়োজন মানবিক শিক্ষা। প্রয়োজন ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান সবকিছুর সমন্বিত চর্চা। প্রয়োজন পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্কসভা।
শিশুকে যদি প্রশ্ন করতে নিরুৎসাহিত করা হয়, তরুণকে যদি মত প্রকাশে ভয় দেখানো হয়- তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুক্তিবাদী হবে না, হবে অনুগত। আর অনুগত মানুষ সহজেই ঘৃণার রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
ঘৃণা কখনোই জ্ঞানের মাধ্যমে ছড়ায় না। ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে অজ্ঞতার মাধ্যমে। ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে রক্তের অক্ষরে।
অজ্ঞতার খেসারত শুধু ব্যক্তি নয়, সমাজও দেয়। একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষকে হত্যা করে না; হত্যা করে সহনশীলতা, হত্যা করে মুক্তচিন্তা, হত্যা করে সভ্যতার অগ্রযাত্রা।
আমরা যদি সত্যিই একটি মানবিক, প্রগতিশীল ও সহনশীল সমাজ চাই- তবে আমাদের জ্ঞানের আলো জ্বালাতে হবে। বই পড়তে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, শুনতে হবে, বুঝতে হবে। মতের ভিন্নতাকে সম্মান করতে শিখতে হবে।
কারণ, যে সমাজ জ্ঞানকে লালন করে, সে সমাজে ঘৃণা টিকতে পারে না।
আর যে সমাজ অজ্ঞতাকে প্রশ্রয় দেয়, সেখানে ঘৃণাই হয়ে ওঠে নিয়তি।
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও গণসংযোগবিদ
ই-মেইল: bbqif1983@gmail.com