বাংলাদেশের উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার প্রথম পাদপীঠ 'দারাসবাড়ি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়'

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৩ এএম

প্রাচীন বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশে যে ধর্মশিক্ষা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছিল তা কালের আবর্তে প্রায় সবগুলোই লয়প্রাপ্ত। সেই বৈদিকশিক্ষা থেকে শুরু করে পাল শাসনামলেই পূর্ণমাত্রায় যা বিকশিত হয়। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করলেও পরবর্তীতে নানামুখী বিজ্ঞান ভিত্তিক জীবনমুখী আধুনিক শিক্ষার রূপ পায়। পশ্চিমা বিশ্ব তথা উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের জন্য ছিল অনুকরণীয়।

এ পর্যায়ে অবিভক্ত বাংলায় তথা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে প্রাচীন কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও এগুলোর পরিচয়-শিক্ষা-কার্যক্রম সংক্ষিপ্ত পরিসরে উপস্থাপন করা হলো।

আজ থেকে ৫২৪ বছর আগে বাংলাদেশে প্রথম উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারাসবাড়ি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় প্রাচীন গৌড়ের অখণ্ড বাংলায় অধুনা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায়। ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও সুপ্রাচীন উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার পীঠস্থান হলো দারাসবাড়ি। প্রত্নতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ ও সমাজ গবেষক এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রাচীন গৌড়ের প্রথম ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দাবি করছেন। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলোর মধ্যে দারাসবাড়ি ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই সুপ্রাচীন।

এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বালিয়াদীঘি এলাকায় অবস্থিত। বাংলাদেশ ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় মহানন্দার কোল ঘেঁষে তৎকালীন গৌড়ের লহ্মাতীর বাংলাদেশ সীমানায় ঘোষপুর মৌজায় কোতওয়ালি দরওয়াজা থেকে দক্ষিণ পশ্চিমের সোনা কোতওয়ালি সড়কের পাশে এর অবস্থান। দারাসবাড়ি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন আরও একটি সুনিপুণ ইসলামি স্থাপনা দারাসবাড়ি মসজিদ। যা অনন্য ইসলামি ঐতিহ্য কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

দারাসবাড়ি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়

আরবি “দরস” অর্থ পাঠ করা বা পড়া। এখানে ইসলামি শিক্ষায় দরস বা পাঠ দেওয়া হতো বলেই দারাসবাড়ি নামেই এলাকার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সমাজ ইতিহাস চর্চা করে দেখা যায় যে, দারাসবাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল দারাসবাড়ি মসজিদ। এই স্থাপনাটির পূর্ব ও পশ্চিমে দুটো পুকুর ছিল  আর এদের মাঝখানে স্থাপিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি।

ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায় যে, বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্বকালে ১৫০২ সালে পবিত্র রমজান মাসের প্রথম রোজায় অখণ্ড বাংলার আদি রাজধানী গৌড়ের ফিরোজপুর এলাকায় দারাসবাড়ি নামে একটি উচ্চ পর্যায়ের ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় যা যা দারাসবাড়ি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ভৌত অবকাঠামো, ছাত্রাবাস, শিক্ষাপাঠ্যক্রম সহ সার্বিক দিক বিবেচনায় নিলে এটি ছিল পূর্ণাঙ্গ আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় সদৃশ।

অখণ্ড বাংলায় স্থাপিত এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বোখারি ও মুসলিম সহ সিহাহ সিত্তাহ হাদিসের ওপর মৌলিক শিক্ষা দেওয়া হতো। দেশ বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম শিক্ষার্থীরা এখানে জড়ো হতেন। এই প্রতিষ্ঠানে মুহাম্মদ বিন ইয়াজদান বখশ একজন বুজুর্গ আলেম নিজ হাতে বোখারি শরিফ আরবি থেকে ফারসি ভাষায় অনুবাদ ও সম্পাদনা করে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন।

দারাসবাড়ি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কানসাটের কাছাকাছি সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত বর্গাকৃতির এই স্থাপনাটির প্রতি বাহুর দৈর্ঘ্য ৩৭ দশমিক ৫০ মিটার পরিমাপের চতুষ্কোণ ব্যতীত তিন বাহুতে এক সারি করে প্রকোষ্ঠ এবং তিন বাহুর মধ্যবর্তী স্থানে তিনজন ইমামের জন্যই তিনটি করে অবতল মেহরাব। স্থাপনার দেয়ালগুলোতে পোড়ামাটির ফলক ও নানা নক্সায় অলংকৃত। এই কমপ্লেক্সে ৩৭টি কক্ষ ও ১টি ওয়াক্তিয়া মসজিদ রয়েছে। আর রয়েছে প্রতিষ্ঠান প্রধানের জন্য নির্ধারিত দফতর ও তিনটি প্রবেশ পথ। দারাসবাড়ি ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ৪০টি কক্ষ বিশিষ্ট হওয়ায় দারাসবাড়িকে চল্লিশ ঘর বা চল্লিশবাড়ি নামেও অভিহিত করা হয়। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির দৈর্ঘ্য ৯৯ ফুট ৫ ইঞ্চি প্রস্থে ৩৪ ফুট ৯ ইঞ্চি। এই ভবনের সাথে ১০৭ ফুট বারান্দা সহ ভবনের পশ্চিমে কারুকার্যময় ৯টি মেহরাব রয়েছে এবং উত্তর ও দক্ষিণে ৩টি করে জানালা রয়েছে বিধায় এই স্থাপনার গঠন শৈলী দেখে মনে করা হয় মহিলাদের জন্যও পৃথক নামাজের ব্যবস্থা এখানে ছিল। আজ যা বিলিনীয়মান। ৫০০ বছরেরও অধিক সময় আগে নির্মিত এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশ স্বাধীনের পর একই ৭০ এর দশকে স্থানীয় কৃষকের লাঙ্গলের ফলায় আবির রঙের মাটি ও পুরাতন ইটের সন্ধান থেকেই আবিষ্কৃত হয় হারিয়ে যাওয়া এই দারাসবাড়ি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিদর্শন। যা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রূপে বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া সবচেয়ে প্রাচীন ইসলামি ঐতিহ্য দারাসবাড়ি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। আবিষ্কৃত হয় নতুন এক অধ্যায়।

দারাসবাড়ি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়

কালের প্রবাহে দারাসবাড়ি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় আজ লয়প্রাপ্ত। তবুও প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন-ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, একদিন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক-গবেষকদের পাদভারে মুখরিত ছিল। কত সমৃদ্ধ ছিল এই জনপদ। ভগ্নপ্রায় দেয়ালের এক তৃতীয়াংশ ও বহু-গর্ভস্থ ভীত প্রমাণ করছে যে, এক সময় এ অঞ্চল ছিল সুশিক্ষিত, আলোকিত ও আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক মুসলিম শিক্ষার অনন্য তীর্থভূমি। ঐতিহাসিকরা বলছেন, প্রাচীন বাংলার এই অংশে তৎকালীন সময়ে প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয়। যার কারণে শিক্ষার্থী ও অধ্যাপকবৃন্দ এই আঙিনা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। এমন কি পার্শ্ববর্তী লোকালয়ও জনশূন্য হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে উদ্যোগহীনতায় শিক্ষা কার্যক্রম পূর্বের ন্যায় ফিরিয়ে আনা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা,জলোচ্ছ্বাস অথবা রাজনৈতিক হানাহানিতে হারিয়ে গেছে এই ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবগাঁথা ইতিহাস।

লেখক: শিক্ষক, গবেষক 
চেয়ারম্যান (অব)
রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড।

YA
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত