জন-আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতা: সাধারণ মানুষের অস্বস্তি

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভার আকার বৃদ্ধি, বেশ কিছু সদস্য ও উপদেষ্টাদের নিয়োগ এবং তাঁদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে রাজনৈতিক প্রশ্ন ও এক ধরনের নাগরিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তবে বর্তমান সরকার গঠনের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় মন্ত্রিসভার পরিধি ক্রমাগত বড় করা এবং সাথে সমান্তরালভাবে উপদেষ্টাদের নিয়োগ দেওয়ার কৌশলটি নিয়ে জনমনে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। আমরা জানি, যে সরকারের প্রশাসনে থাকা সব সদস্যের প্রতি শতভাগ জনসন্তুষ্টি অর্জন করা কঠিন তবে এটাও মনে রাখতে হবে, বিপ্লব উত্তর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে  সাধারণ মানুষ স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে। এবার আসি, জনমনে এই অস্বস্তি তৈরি হওয়ার মূল কারণগুলো কি সেটা নিয়ে-

১. মন্ত্রিসভার বিশাল আকার ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়

* জনবল ও অপচয়: বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫০ পার হয়ে গেছে। একই সাথে একাধিক উপদেষ্টা নিয়োগের কারণে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে এত বড় মন্ত্রিসভার ব্যয়ভার বহন করা কতটা যৌক্তিক?

* দ্বৈততার সংকট: অনেক মন্ত্রণালয়ে পূর্ণ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি আলাদা উপদেষ্টা রাখা হয়েছে। এই প্রশাসনিক জটিলতা কাজের গতি বাড়ানোর চেয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক ধোঁয়াশা বাড়াচ্ছে বলে মানুষ মনে করে।

২. যোগ্যতা ও অতীত ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে বিতর্ক

* বিতর্কিত অতীত: মন্ত্রিসভার কোনো কোনো সদস্য এবং উপদেষ্টার অতীত রাজনৈতিক অবস্থান বা দলীয় আনুগত্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা চলছে। পূর্বের সুবিধাভোগী বা সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহ রয়েছে।

* বিপ্লবের স্পিরিট ক্ষুণ্ন হওয়া: ২৪-এর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের অনেকের বিরুদ্ধে পুরনো আমলের "সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র" বা দলীয়করণের প্রবণতা লক্ষ্য করায় সাধারণ মানুষ হতাশ হচ্ছে।

৩. সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন

* স্বচ্ছতার অভাব: সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের বড় বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি যেমন, চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান ক্রয় বা উচ্চ-মূল্যের উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণকে কতটা আস্থায় নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। 

* আইন-শৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা: সরকারের বেশ কিছু মাস পার হওয়ার পরও জননিরাপত্তা, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে মন্ত্রী পরিষদ ও উপদেষ্টাদের দৃশ্যমান দুর্বলতা বা দূরদর্শিতার অভাব আমজনতার দৈনন্দিন জীবনকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে।

৪. দলীয় একাধিপত্য ও জবাবদিহিতা এড়ানো

* অবাধ ক্ষমতার চর্চা: সমালোচকদের মতে, বর্তমান মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যের মাঝে জবাবদিহিতার তীব্র ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো উপদেষ্টা বা মন্ত্রীর বক্তব্য এবং আচরণে জন-আকাঙ্ক্ষার চেয়ে দলীয় প্রতিহিংসা ও পুরোনো ধারার রাজনীতির প্রতিফলন ঘটছে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।

পরিশেষে বলবো, সাধারণ মানুষের এই অস্বস্তি কোনো ভিত্তিহীন ক্ষোভ নয়; বরং এটি দীর্ঘ এক নিয়মতান্ত্রিক শাসনের পর একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ রাষ্ট্র ব্যবস্থা দেখার আকুলতা। আমরা জানি যে কোনো সরকারের সব সদস্যের প্রতি শতভাগ সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব নয় তবে সরকার যদি জনমানুষের এই সমালোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিতর্কিত সদস্যদের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ না নেয় এবং মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা বৃদ্ধি না করে, তবে জনগণের কাছে তাদের সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।

লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক